শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে অনড় ককরোচরা, সংস্কারে চাপ আদালত ও মোদীর

সরকারের সঙ্গে বৈঠকেও সমাধান হয়নি, ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ২৬ দিনের অনশন ভাঙলেন সোনম ওয়াংচুক

আজাদী ডেস্ক | শনিবার , ২৫ জুলাই, ২০২৬ at ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ

প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন আরও জোরালো করেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সরকারের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠকেও কোনো সমাধান না হওয়ায় সংগঠনটি মোদি সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে। তবে সরকারি সূত্র স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের কোনো সম্ভাবনা নেই। এদিকে ২৬ দিনের অনশন ভেঙেছেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। একই সময়ে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে আরও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, আর স্থায়ী সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত।

গতকাল শুক্রবার নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেন সিজেপির প্রতিনিধি সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। বৈঠক শেষে রাঙ্কা জানান, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে তারা একচুলও নড়েননি। তার ভাষায়, সরকার দুটি দাবির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। সেগুলো হলো, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার। তবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে সরকার শনিবার (আজ) বিকেল পর্যন্ত সময় চেয়েছে। রাঙ্কা বলেন, আমরা আশা করছি সরকার দ্রুত ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে দেবে। অন্যথায় আন্দোলন চলবে।

সরকারের পক্ষ থেকেও বৈঠককে ইতিবাচক বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা জানান, আন্দোলনকারীদের তিনটি দাবিই শুনেছে সরকার এবং সেগুলো নিয়ে আবার আলোচনা হবে। তবে আলোচনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। সরকারি সূত্রের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের কোনো সুযোগ নেই। এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার মনে করে পদত্যাগ সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্ত। কিন্তু জনগণ আমাদের যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, সেই দায়িত্ব পালনের দিকেই আমরা মনোযোগী। সরকার বরং শিক্ষামন্ত্রীর পাশেই রয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় যেসব চক্র জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারের এই অবস্থান প্রকাশের পর আন্দোলনকারীরাও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সরকার শনি ও রোববার আরও বড় জমায়েত ঠেকাতে শুক্রবার রাতেই তাকে এবং সংগঠনের অন্য নেতাদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করতে পারে। তিনি বলেন, সরকার যদি মনে করে গ্রেপ্তার করে আন্দোলন থামিয়ে দেবে, তাহলে সেটা তাদের সবচেয়ে বড় ভুল হবে। সোনম ওয়াংচুককে তুলে নেওয়ার পর আন্দোলন থামেনি, বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জের পরও আন্দোলন বেড়েছে। আমাদের আটক করা হলে এই আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়বে। সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাসও একই সুরে বলেন, সরকারকে এমন ভুল পদক্ষেপ না নেওয়াই উচিত। এতে পরিস্থিতি আরও অস্থির হবে।

এর মধ্যেই আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠা লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক ২৬ দিনের অনশন ভেঙেছেন। সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার আশ্বাস পাওয়ার পর গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে তিনি অনশন শেষ করেন। অনশন ভাঙার সময় তার পাশে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে দেওয়া এক পোস্টে ওয়াংচুক জানান, দীর্ঘ আলোচনার পর এবং সম্ভাব্য সহিংসতা এড়াতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, আন্দোলনকে অহিংস রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াংচুকের অনশন প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এঙে দেওয়া এক বার্তায় তিনি তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলার আহ্বান জানান।

এর কয়েক ঘণ্টা পরই ভিডিও বার্তায় প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন মোদী। তিনি বলেন, প্রশ্নফাঁস কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেছে এবং পরীক্ষার্থীদের একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট না হয়, সে লক্ষ্যেই দ্রুত পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রশ্নফাঁসসংক্রান্ত মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ফাস্টট্র্যাক আদালতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভায় এ বিষয়ে আলোচনা শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এরই মধ্যে দিল্লি হাই কোর্ট প্রশ্নফাঁসসংক্রান্ত মামলার জন্য বিশেষ ফাস্টট্র্যাক আদালত গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। একই রাতে কেন্দ্রীয় সরকার শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়েও বড় ধরনের রদবদল আনে। উচ্চশিক্ষা ও স্কুল শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে প্রশ্নফাঁস রোধে সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার ওপর নজর রাখার কথা জানিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। গত বৃহস্পতিবার শুনানিতে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, বছরের পর বছর অস্থায়ী ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা পরিচালনা করার ফলে সংকট আরও গভীর হয়েছে। এখন স্থায়ী, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই। সরকার আদালতকে জানিয়েছে, আগামী বছর থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষা ধাপে ধাপে কম্পিউটারভিত্তিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আদালত প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষার আগে সাইবার নিরাপত্তা, প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে।

গত কয়েক সপ্তাহে প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন দিল্লির বাইরে মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, কর্নাটক, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা, উত্তর প্রদেশ ও ছত্তিশগড়সহ অন্তত ৩৬টি বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। কংগ্রেসসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অনেক সমাজকর্মী, শিক্ষাবিদ ও বলিউড তারকাও সংহতি প্রকাশ করেছেন। গত সোমবার সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা করলে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও লাঠিচার্জ করে। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বুধবার রাতে নতুন করে সংঘর্ষের পর যন্তর মন্তর এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পরও দুই পক্ষের অবস্থানে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। আন্দোলনকারীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া অন্য কোনো সমাধান মানতে রাজি নন। অন্যদিকে সরকারও স্পষ্ট করেছে, ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরানোর প্রশ্নই উঠছে না। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংকট আপাতত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ারই আভাস মিলছে।

তরুণসমাজের আন্দোলনের প্রতি কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোও সমর্থন জানিয়েছে। এ আন্দোলনকে ঘিরে চলতি সপ্তাহে ভারতের সংসদে শুরু হওয়া বর্ষাকালীন অধিবেশন বারবার মুলতবি হচ্ছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবঙ্গভবনে কে যাচ্ছেন, আলোচনায় কারা
পরবর্তী নিবন্ধচেরাগী মোড় থেকে অপহরণের ৬ ঘণ্টা পর রাঙ্গুনিয়ায় মা-ছেলেকে উদ্ধার