শাহ আলম নিপু : সদানন্দে সমর্পিত কর্মচঞ্চল এক মানুষ

ড. আজাদ বুলবুল | শনিবার , ১ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ

মৃত্যু পৃথিবীর চিরন্তন রীতি। মানুষের জন্ম হয় মৃত্যুর জগতে পৌঁছার জন্য। সে কারণে মানুষের চৈতন্যে মৃত্যু একটি স্বাভাবিক ঘটনা ও শাশ্বত বিষয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন শাহ আলম নিপু ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুকে ঠিক সেভাবে মেনে নিতে পারছি না। নিপু ভাই পরিণত বয়সের মানুষ। যে বয়সে মানুষ মৃত্যুপথযাত্রী হন, নিপু ভাই সে বয়সের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। কিন্তু সদানন্দে সমর্পিত কর্মচঞ্চল একজন মানুষ যখন অসুখবিসুখে হোক বা দুর্ঘটনায় হোক, হুট করে চলে যানতখন সেই বিয়োগ ব্যথা হৃদয় ভেঙে দেয়। সকল অন্তরাত্মা জুড়ে হাহাকার জাগায়। নিপু ভাইয়ের দুর্ঘটনাজনিত আকস্মিক মৃত্যু কেবল তাঁর পরিবারবর্গের নয়, সকল বন্ধুবান্ধব, অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীর হৃদয়ভাঙা দীর্ঘশ্বাসের, কারণ, অব্যক্ত বেদনার দহন।

মহিউদ্দিন শাহ আলম নিপু ছিলেন পূর্ণমাত্রার সামাজিক ব্যক্তিত্ব। জানাজা, শোকসভা, মেলা, উৎসব, বিয়ে, পানসল্লা, আকদ্‌ অনুষ্ঠানে থাকতো তাঁর অনিবার্য উপস্থিতি। তিনি রাষ্ট্রীয় বড়ো পদে চাকরি করেন নি। জনপ্রতিনিধি হন নি। আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের তকমাও গলায় পরেন নি। একজন সাধারণ ব্যবসায়ী হিসাবে সাধারণ্যে তিনি বিকশিত ছিলেন।

পড়েছেন কলেজিয়েট হাই স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষা জীবনে তিনি ছিলেন দক্ষ সংগঠক, সৃজনশীল সম্পাদক ও বন্ধুবৎসল তুমুল আড্ডারু। এই তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তনীদের সম্মিলন ঘটানোর জন্য তৎপর ছিলেন আজীবন।

নিপু ভাই ছিলেন চট্টগ্রামের শিল্প সাহিত্যের মানুষদের প্রাণের সখা। নবীন লেখকদের উৎসাহ যোগাতেন। কনিষ্ঠদের প্রতি তাঁর অপাত্য স্নেহ সবসময় সঞ্চারিত ছিল। লেখক, প্রকাশক, মুদ্রক, বাঁধাই শিল্পী সবার খোঁজ খবর নিতেন পরম মমতায়। একটা প্রশান্ত হৃদয় দিয়ে সবার অন্তর ছুঁতে চাইতেন তিনি। হাসিমুখে সুবচন দিয়ে আপন হয়ে যেতেন। সবাইকে নিয়ে, ঐক্যমত্যের মাধ্যমে সাংগঠনিক কাজগুলো সম্পাদন করার চেষ্টা করতেন। অসংখ্য সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন নিপু ভাই। নিজের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করেছেন নানামুখী পর্ষদ। নিপু ভাইয়ের সাংগঠনিক দক্ষতার কারণেই তিনি অনিবার্য হয়ে উঠতেন সভা, সমিতি, সংসদে।

১৯৭০ সাল। অসহযোগ আন্দোলনে টালমাটাল সারাদেশ। চট্টগ্রামও বাদ পড়েনি সেই উত্তেজনা থেকে। সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেও ক্ষমতা পায়নি আওয়ামী লীগ। দেশব্যাপী মুক্তিকামী ছাত্র জনতা বিক্ষোভে ফুঁসছে। রাস্তায় নেমেছে মিছিল। কারখানায় চলছে অবরোধ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পালিত হচ্ছে ধর্মঘট। স্বাধীকারের আকাঙ্ক্ষা রং ও রেখায় চিত্রভাষ্য হয়ে ফুটে উঠছে নগরের দেওয়াল জুড়ে। নিপু ভাই সামিল হলেন আন্দোলনসংগ্রামে। তিনি তখন উনিশ বছর পেরুনো প্রতিবাদী যুবক। দেশ মাতৃকার স্বাধীকার অর্জনে যোগ দিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। কাঁধে তুলে নিলেন রাইফেল, বুকে তাঁর স্বাধীনতার স্বপ্ন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের অপার্থিব আনন্দে বেরিয়ে পড়লেন গলায় ক্যামরা ঝুলিয়ে। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, বিপন্নতা, বিজয়ী মানুষের আনন্দ মিছিল, পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ; এমনি অসংখ্য দৃশ্য ক্যামরাবন্দী করলেন পরম সাহসে। তাঁর নিজ হাতে তোলা যুদ্ধকালীন ছবি নিয়ে স্মৃতি৭১শিরোনামের গ্রন্থটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য দলিল হিসাবে বিবেচিত।

চাকসু জিএস গোলাম জিলানী চৌধুরী ছিলেন আমার আব্বার স্নেহভাজন। দুজনই একই এলাকার ও ব্যবসায়িক কারণে সম্পর্কিত। গোলাম জিলানী চৌধুরীকে বাবার সূত্রে কাকা ডাকতাম। সেই আশির দশকে তাঁর মাধ্যমে পরিচয় ঘটে নিপু ভাইয়ের সাথে। তার পর অবশ্য দীর্ঘ দিনের ব্যবধান।

নিপু ভাই মুদ্রণ ব্যবসা করেন। আগ্রাবাদ শেখ মুজিব রোডে তাঁর ছাপাখানা। কিন্তু কাগজ, কালি, প্লেট, ব্লক, বাঁধাই, মুদ্রণসামগ্রী; সবকিছুর আড়ত হলো আন্দরকিল্লা এলাকায়। অথচ শেখ মুজিব সড়কের বিচ্ছিন্ন (পাঠানটুলীর রাঙ্গুনিয়া প্রেস ছাড়া আর কোনো ছাপাখানা না থাকা অর্থে) পরিবেশে রয়ে যায় ‘নিবেদন প্রেস’। সেখান থেকে নিয়মিত নজির আহমদ চৌধুরী রোড, আন্দরকিল্লা, চন্দনপুরা, মোমিন রোডে যাওয়া আসা করেন নিপু ভাই। বনেদী ছাপাখানার মালিক ও সিনিয়র ব্যবসায়ী হিসাবে সবাই তাঁকে মান্য করে, শ্রদ্ধা করে। একদা যে তরুণটি নিবেদন প্রেসের মেশিনম্যান ছিলকালের বিবর্তনে এখন সে হয়তো কয়েকটি ছাপাখানার মালিক। নিপু ভাই তার সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখেন, আদরে প্রশ্রয়ে কাছে ডাকেন। স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে কুশল জানতে চান-‘ভালা আচোনি ভাই?’

২০০৬ সালের কথা। আমি তখন সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে পড়াই। কলাভবন থেকে ক্লাস শেষ করে দাঁড়িয়ে আছি সেগুনতলায়। দেখি প্রিন্সিপ্যাল ফজলুল হকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রশাসনিক ভবন থেকে বেরিয়ে আসছেন নিপু ভাই। আমি হাত তুলে সালাম দেই। কুশলাদি বিনিময় শেষে তিনি বলেন– “আমার ‘কালধারা’র চট্টগ্রাম সংখ্যা বাইর অইতেচে। এ্যাকটা লেখা দিবা।”

আমি বললামকখন দিতে হবে ভাই?

নিপু ভাই বলেলন-“লেখাজোখা বেয়্যাক পাই গেচি। দেও, একটু তাড়াতাড়ি করি দিলে বালা অয়”। আগ্রহ ভরে জানতে চাইলামচট্টগ্রামের বিষয়ে লেখা না দিয়ে যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখা দেই, চলবে?

নিপু ভাই খুশি গলায় সোৎসাহে বললেনচইলবো, চইলবো, লেকতা হাইল্লে আরও বালা অইবো।

তিন চার দিনের মাথায় আমি শেখ মুজিব রোডের নিবেদন প্রেসে গিয়ে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাহিত্যিক’ শিরোনামের নাতিদীর্ঘ একটা প্রবন্ধ তাঁর হাতে দেই। লেখা মানে কাটা ছেঁড়ায় ভরা, দাগদুগ টানা একতাড়া কাগজ। নিপু ভাই শিরোনাম দেখে আর পড়লেন না। কম্পিউটারে বসা ফাহিন ভাইয়ের হাতে দিয়ে বললেন

এইডা তাড়াতাড়ি কম্পোজ করি হালাও।”

আমি বলি

পড়ে দেখলেন ভাই!

তিনি স্মিত হাসি দিয়ে বললেনআগে কম্পোজ হোক।

এর পরে কালধারার প্রত্যেকটি সংখ্যায় আমাকে দিয়ে পাহাড় ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জনজাতির ভাষাসংস্কৃতি বিষয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন। লেখা চাওয়ার সময় নিপুভাই আগেভাগে বলে দিতেন– “তুঁই পাহাড় লই লেইকবা, ব্যাস”।

আমরা সেই ভাগ্যবান মানুষ যারা নিপু ভাইয়ের আদর, স্নেহ, প্রশ্রয় পেয়েছি। তাঁর বয়সী অনেকেই এই শহরে ছিলেন বা আছেন যারা পদের মাহাত্ম্যে আভিজাত্যের দর্পে, জনপ্রিয়তার অহংবোধে তরুণদের এড়িয়ে চলেন। সম্মান ও মর্যাদা প্রাপ্তির মাপকাঠি বিচার করে সভা, সমিতিতে গমন করেন। নিপু ভাই ছিলেন এসব লৌকিকতার উর্ধ্বে। ভালো কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ কোন ব্যক্তির স্মরণে সভা হচ্ছে কিংবা সাহিত্য সংস্কৃতির পূর্বাপর নিয়ে কোথাও বৈঠক হচ্ছেখবর পেলে নিপু ভাই অবধারিতভাবে সেখানে অংশ নিতেন। কেবল দাওয়াত দিলে আর অতিথি বানালেই যাবো, এ ধরনের সংস্কারে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। একজন সাদা মনের মানুষ হিসাবে কল্যাণ ও মঙ্গলবারতা ছড়িয়ে দেয়ার মানসে তিনি শহর চট্টগ্রাম চষে বেড়াতেন।

নিপু ভাই এখন শুয়ে আছেন তাঁর বাল্যকালের স্মৃতি বিজড়িত মিঠানালা গ্রামের ছায়াঘেরা কাদির বক্স ভুঁইয়া বাড়ির পারিবারিক গোরস্থানে। ১৯৫২ সালের ২১ মে তারিখে রেলওয়ে কর্মকর্তা ওয়াজি উল্লাহ ভুঁইয়ার ঔরসে যে শিশুটি এসেছিল ধরাধামে সবাইকে হাসিয়ে, অজস্র গুণগ্রাহী দুনিয়ায় রেখে চলে গেলেন পরপারে। সবই রইলো, সবাই থাকলো, নিপু ভাইয়ের জন্য ‘কেবল মায়া রহিয়া গেল’।

ভুঁইয়া বাড়ির বিশাল গোরস্থানে শান্ত সমাহিত পরিবেশ। বুনো ঘাস আর বহুবর্ণের পাতাবাহারের ঝোপ যেন বিরহের রাগিনী তোলে। কেউ না জানুকমিঠানালার ধানী জমি থেকে উড়ে আসা ঘাসফড়িং জানে, পুকুরের শান্ত জলে টুপ করে ডুব মারা মাছরাঙ্গা জানে, তাল গাছের উঁচু ডালে ঝুলতে থাকা বাবুই পাখি জানেএক সরলমনা, নিরহংকারী, নির্বিরোধী চিরশিশু শুয়ে আছেন এখানে এই ঘাস বিছানো মাটির নিচে। তাঁর বিরহে বিমর্ষ চেরাগীর আড্ডা, বাতিঘরে বইয়ে গোঁজা পাঠকের মুখ, শিল্পকলা একাডেমির প্রাণবাণ সংস্কৃতিজন।

আমরা হয়তো স্বপ্নের ঘোরে দেখতে পাবো চন্দনপুরার পুরাতন বাড়িঘর পেছনে রেখে, আন্দরকিল্লা মোড়ের ভিড়ভাট্টা মাড়িয়ে ধীরপায়ে মোমিন রোডের একপাশ ধরে এগিয়ে চলছেন এই নগরের পাঁচ যুগের সাক্ষী মহিউদ্দিন শাহ আলম নিপু ভাই।

লেখক: গবেষক, কথাশিল্পী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইউসুফ জাফরের অনুপম কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে পাবার জন্য হে সখা’
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে