বসুন্ধরা ঢাকার অভিজাত আবাসিক এলাকা। যাকে গুলশান বনানী বারিধারা ও উত্তরার মত একই কাতারে বিবেচনা করা হয়। এলাকাটি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র ও এয়ারপোর্টের কাছাকাছি পরিচ্ছন্ন নিরাপদ ও পরিকল্পিত হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত জনগোষ্ঠীর পছন্দের শীর্ষে থাকা একটি এলাকা। তাই ফ্ল্যাট ও প্লটের দাম অন্যান্য অভিজাত আবাসিক এলাকার মত বেশ দামি। এতে রয়েছে প্রচুর কমার্শিয়াল ও আবাসিক ভবন। রয়েছে মার্কেট হাসপাতাল খেলার মাঠ স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানান স্থাপনা। আশ্চর্যের বিষয় হলো নাগরিক সব সুযোগ সুবিধা ও রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে হলেও এটি ঢাকার সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন নয়। ফলে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার গৃহকর ও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিগত দিনে এই এলাকাটি সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই এটিকে ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র’ বলা যেতে পারে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাটি পরিচালনা করে ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড। যা বসুন্ধরা গ্রুপের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। এর রয়েছে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ফটক ও সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। সমপ্রতি সরকার এই এলাকাটিকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কাঠামোর ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জানা যায়, এলাকাটিতে ব্যক্তিমালিকের কাছ থেকে কেউ জমি কিনলে বসুন্ধরা গ্রুপের আবাসন কোম্পানিকে কাঠাপ্রতি ৫ লাখ টাকা বাড়তি দিতে হয়। যা জমির দাম ও সরকার নির্ধারিত করের বাইরে। যদিও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে এই টাকার পরিমাণ ছিল কাঠাপ্রতি ১০লাখ। বসুন্ধরার ‘অনুগত’ মালিক সমিতি বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ফ্ল্যাটমালিকদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ আদায় করে। আরো নানা ভাবে টাকা নেওয়া হয় ফ্ল্যাট ও জমির মালিকদের কাছ থেকে। রাস্তাঘাট উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, খেলার মাঠসহ নাগরিক সুবিধাদির নিয়ন্ত্রণও করে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ। প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর আয়তনের এই বিশাল এলাকায় রয়েছে বসুন্ধরার নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী। চলাচলের জন্য রয়েছে তালিকাভুক্ত রিকশা। এই এলাকায় বসুন্ধরা গ্রুপের তৈরি পণ্য (গৃহস্থালি ও নির্মাণ সামগ্রী) ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত নয় বিধায় এখান থেকে গৃহকর নিতে পারে না ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, খেলার মাঠসহ নাগরিক সুবিধাদির নিয়ন্ত্রণও সিটি করপোরেশনের হাতে নেই।
ইতিপূর্বে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৬ সালের ২৮ জুন এই আবাসিক এলাকাকে সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশিত করে। যদিও গেজেট অনুযায়ী সেখানে সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এই চেষ্টা হয়েছিল। তবে সে সময় সরকার জোরালো কোন পদক্ষেপ নেয়নি।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা–সিটি করপোরেশনের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। জানা যায় মার্চে প্রধানমন্ত্রী বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দেশ দেন। এরপর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একটি প্রতিবেদন তৈরি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায়। ৭ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব পাস হয়। ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী এ–সংক্রান্ত নথি অনুমোদন করেন। এলাকাটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে এলে বসুন্ধরা গ্রুপ অথবা বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি জমি ও ফ্ল্যাটমালিক এবং বাসিন্দাদের কাছ থেকে কোনো টাকা বা ফি নিতে পারবে না। মালিকেরা সরকার–নির্ধারিত গৃহকর দেবেন। নাগরিক সেবা দেবে সিটি করপোরেশন। একসময় অধিক জনসংখ্যাকে যে কোন দেশের জন্য অভিশাপ হিসাবে বিবেচনা করা হতো। চীনের জনসংখ্যাকে তাদের জন্য বোঝা মনে করা হতো। কিন্তু সেই অধিক জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে চীন আজ বিশ্বে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে। চীনে একসময় ‘একটি সন্তান যথেষ্ট’ শ্লোগান দেওয়া হলেও এখন অধিক সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তবে যেসব দেশ তাদের জনসংখ্যাকে মানব সম্পদে রূপান্তরিত করতে পারেনি,তারা এখনো সেই দরিদ্র দেশ হিসাবেই রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে আফ্রিকার দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা তাদের জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তরিত করতে না পারার জন্য আজো বিশ্বে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাতারে রয়ে গেছে। গত এপ্রিলে প্রকাশিত বিশ্ব সমীক্ষায় জনসংখ্যার হিসাবে জনসংখ্যার দিক দিয়ে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে চীন। অর্থাৎ জনসংখ্যার দিক দিয়ে বর্তমানে ভারত এক নাম্বার। এরইমধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা ছাড়িয়েছে ৮০০ কোটি। বর্তমানে এই দুই দেশে পৃথিবীর মোট ৩৫ শতাংশ মানুষ বসবাস করছে। পৃথিবীর এই বিশাল জনসংখ্যা নিয়ে চলছে আলোচনা। এটাকে যেমন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তেমনি দেখা হচ্ছে সম্ভাবনা হিসেবেও।
এদিকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাড়ছে সন্তান জন্মদানের হারও। আগে প্রতি ১০ জন মা মোট ২৩ জন সন্তানের জন্ম দিতেন। এখন সেই সংখ্যাটা হয়েছে ২৪। বাড়ল মাত্র একজন, কিন্তু সেটাই বড় এক চাপ এবং ঝুঁকির আলামত হয়ে এসেছে। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা এমন পরিস্থিতির মধ্যে বড় বিপদ দেখছেন। জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রথমবারের মতো মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) বেড়েছে। অর্থাৎ মায়েদের গড় সন্তান সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। টিএফআর হলো একজন নারী প্রজনন বয়সে (১৫ থেকে ৪৯ বছর) যত সন্তানের জন্ম দেন, সেটা। পাশাপাশি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত জনবল সংকট চলছে, সরকারিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ নেই এবং অনেক দম্পতি প্রয়োজনের সময় তা পাচ্ছেন না। এই সংকটটি প্রকট হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শেষ দিক থেকে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমল জুড়ে। এখনো সংকটগুলো দূর করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিএফআর বাড়ার পেছনে রয়েছে অনেক সংকট।
আসলে বাংলাদেশের সমস্যার কোনও শেষ নেই। চারদিকে শুধু সমস্যা অব্যবস্থাপনা আর অনিয়ম। তবে এসব সমস্যা সমাধান করতে প্রয়োজন সমস্যা চিহ্নিতকরণ, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, সঠিক পরিকল্পনা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দেশপ্রেম ও এর সঠিক বাস্তবায়ন। আর এটি করতে পারলেই সমাধান করা সম্ভব–সব সমস্যার।
লেখক: কলামিস্ট












