খাগড়াছড়ির রামগড়ে বন্ধ থাকার দুই দশক পর একটি আবাসিক বিদ্যালয় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। ২০০৬ সালে বিদ্যালয় ভবনের উদ্বোধন হলেও সেটি এখনো চালু হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড়ের ওপর ১২ একর জায়গাজুড়ে আবাসিক বিদ্যালয়টি। সীমানাপ্রাচীর পেরোতেই একতলা বিদ্যালয় ভবন। পাশে শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য হোস্টেল। শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য রয়েছে ডরমিটরিও। রামগড় বাজার থেকে তিন কিলোমিটার দূরে তৈচালা পাড়ায় এই রামগড় আবাসিক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সবই রয়েছে। শুধু নেই কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করে বিদ্যালয়টি।
বিদ্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, ভেতরের দেয়ালগুলো লতায় ঢাকা। শ্রেণিকক্ষের দরজা ও জানালায় জং ধরেছে। ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। নষ্ট হয়ে গেছে বেঞ্চ, চেয়ার ও ব্ল্যাকবোর্ড। হোস্টেল ভবনে হলরুম, ডাইনিং, অফিসকক্ষসহ নানা সুবিধা রয়েছে। তবে ভেতরে থাকা খাট, লেপ, তোশক, বেডশিট, বালিশ, মশারিসহ নানা আসবাবে পচন ধরেছে। বিদ্যালয় ও আবাসিক সুবিধা চালানোর মতো বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, পানির পাম্প, পানির ট্যাংক, রান্নাঘরসহ প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস রয়েছে ভেতরে। তবে অধিকাংশ জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য এলাকায় অনাথ বালক–বালিকাদের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিন পার্বত্য জেলায় তিনটি আবাসিক বিদ্যালয় নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। ২০০৪ সালে ৩টি প্রকল্পের জন্য ৫ কোটি টাকা করে মোট ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০০৫ সালে রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলায় ও বান্দরবানের রুমা উপজেলায় নির্মিত দুটি বিদ্যালয় চালু হয়। তবে রামগড় উপজেলার বিদ্যালয়টি এখন পর্যন্ত চালু করা হয়নি।
জানা যায়, ২০০৭ সালে রামগড় আবাসিক বিদ্যালয়ের জন্য মাস্টাররোলে চারজন গার্ড, দুজন টেবিল বয়, দুজন আয়া, দুজন পিয়ন ও একজন ঝাড়ুদার নিয়োগ করা হয়। এ ছাড়া ২০০৮ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ৬০ জন অনাথ বালক ও ৬০ জন বালিকার ভর্তির দরখাস্ত জমাও নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয় চালু না হওয়ায় কর্মীদের নিয়োগ ও শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাতিল করা হয়। বিদ্যালয়ের উদ্বোধনী ফলকে দেখা যায়, ২০২৬ সালে ২২ অক্টোবর আবাসিক বিদ্যালয় ভবনটির উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ওয়াদুদ ভূইয়া।
শুক্রবার বিকেলে উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানকে সাথে আবাসিক বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এলাকা পরিদর্শন করেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূইয়া। এসময় তিনি বলেন, ২০০৬ এ যখন খালেদা জিয়া সরকার ক্ষমতায় ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করেছিলাম। তখন জিয়াউর রহমানের কনসেপ্টকে ফলো করে আমরা আমাদের উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে আবাসিক স্কুল স্থাপন করি। এখানে আমরা আবাসিক স্কুলের অবকাঠামো শুরু করছিলাম। পরবর্তীতে যখন ওয়ান ইলেভেন আসে এবং আমারও মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তখন এই কাজটা প্রজেক্টটা বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রজেক্টটা অনেক বড় প্রজেক্ট ছিল। তৎসময়ে এখানে অন্তত ৫ কোটি টাকা অলরেডি খরচ হয়ে গেছে ওই সময়ে। সরকারি টাকায় নির্মিত এই ভবনের অনেককিছু নষ্ট হয়ে গেছে। পিছনে ডরমেটরি আছে। শিক্ষক ভবন বা স্টুডেন্টদের আবাসিক হোস্টেল আছে। আবাসিক বিদ্যালয়টি চালু হলে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ হবে। অনাথ, এতিম এবং যারা দরিদ্র তারা এখানে ফ্রি অফ কস্ট পড়াশোনা করবে। উন্নত মানের শিক্ষক থাকবে, উন্নত ব্যবস্থাপনা থাকবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা বলেন, আজকে আমার আবাসিক স্কুল ভবন পরিদর্শন করেছি। আমি অবাক হচ্ছি, কেন এতদিন বন্ধ ছিল? এখানে রাজনীতির ব্যাপার না। এটাকে রাজনীতি, কিন্তু এখানে যে এই যে একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, এত টাকা খরচ করা হয়েছে, তারপরে এটা শেষ করা হয়নি। এতগুলো সরকারি টাকা খরচ হওয়ার পর এটাকে ভূতের বাড়ি করে রাখা হয়েছে। ছাত্র–ছাত্রীদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এটা জানতামও না। আমরা আবাসিক বিদ্যালয়টি আবার নতুন করে চালু করার জন্য উদ্যোগ নেব।













