চট্টগ্রামের শস্যভাণ্ডার খ্যাত রাঙ্গুনিয়ার গুমাইবিলসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে পাকা ধানের গন্ধে যখন চারপাশ মৌ মৌ করছিল, ঠিক তখনই কৃষকের আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে প্রকৃতির রুদ্ররূপ। বিপুল উৎসাহে ধান কেটে ঘরে তোলার আগমুহূর্তে গত ২৮ ও ২৯ এপ্রিলের হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাতে উপজেলার অনেক স্থানে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তীব্র বাতাসে মাঠের বুক চিরে নুয়ে পড়েছে পাকা ধান, আর বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষকের দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্বপ্ন। উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক তথ্যমতে, ঝড়ে প্রায় ৩০ হেক্টর বোরো ধান এবং ৫ হেক্টর সবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ বলে দাবি কৃষকদের।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে গুমাইবিলে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে শুয়ে পড়েছে সোনার ফসল। কোথাও কোথাও জমিতে জমে থাকা পানিতে ডুবে আছে কেটে রাখা ধানের গোছা। গুমাইবিলের নিশ্চিন্তাপুর এলাকায় দেখা গেছে, শ্রমিকরা পানি থেকে ধান কেটে বস্তায় ভরে কাপ্তাই সড়কে নিয়ে আসছেন। রোদে শুকিয়ে কোনোমতে ফসলটুকু বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। ১১৪ কানি জমিতে আবাদ করা কাটাখালী গ্রামের কৃষক মো. ইসহাক আক্ষেপ করে বলেন, বাতাস আর বৃষ্টিতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। নুয়ে পড়া ধানগুলো শ্রমিক দিয়ে কাটিয়ে আনছি ঠিকই, কিন্তু তিন ভাগের এক ভাগ ধানও পাব কি না সন্দেহ। একই দশা কৃষক নুরুল ইসলামেরও। তিন কানি জমির মধ্যে এক কানি কাটার পরেই তা বৃষ্টির পানিতে দুইদিন ডুবে থেকে পচন ধরতে শুরু করেছে।
কৃষকদের দাবি, একদিকে ধানের নিম্নমুখী দাম, অন্যদিকে শ্রমিকের চড়া মূল্যের মধ্যে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় তাদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। তারা সরকারিভাবে ন্যায্যমূল্যে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের দাবি জানান। যাতে মধ্যস্বত্বভোগী বা ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিতে না পারে সেদিকেও নজর দেয়ার আহ্বান জানান তারা।
টানা দুইদিনের দুর্যোগের পর ৩০ এপ্রিল আকাশ রৌদ্রজ্জ্বল হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, আবহাওয়া এমন থাকলে এবং পানি দ্রুত নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুব একটা বাড়বে না। গুমাইবিলের মরিয়মনগর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা উত্তম কুমার শীল জানান, জমে থাকা পানি সরাতে স্লুইচ গেটগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। রোদ ওঠায় নুয়ে পড়া ধান কেটে শুকিয়ে নিলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস জানান, রাঙ্গুনিয়ায় এবার ৯ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে বোরোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কালবৈশাখীতে কিছু এলাকায় ফসলের ক্ষতি হলেও সামগ্রিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় বাধা হবে না। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। তবে সরকারি আশ্বাস ছাপিয়ে কৃষকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। প্রকৃতি আবার কখন বিরূপ হয়ে ওঠে, সেই শঙ্কায় দ্রুত ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন রাঙ্গুনিয়ার কয়েক হাজার চাষি।














