রহিমের ছোট্ট ত্যাগ

সরোজ আহমেদ | বুধবার , ২০ মে, ২০২৬ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ

গ্রামের নাম ডুমুরিয়া। সবুজ মাঠ, কাঁচা রাস্তা আর নদীর ধারে ছোট ছোট ঘরসব মিলিয়ে যেন এক শান্তির নীড়। সেই গ্রামেই থাকে রহিম, তার মা, আর ছোট বোন সুমি। তাদের ঘরখানা ছোট, কিন্তু ভালোবাসায় ভরা।

ঈদুল আজহা আসতে আর বেশি দেরি নেই। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে চলছে ব্যস্ততা। কেউ গরু কিনছে, কেউ ছাগল। বাজারে মানুষের ভিড়, শিশুদের মুখে হাসিসব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ।

রহিম প্রতিদিন বাজারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় থেমে থেমে ছাগলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে একটাই ইচ্ছে-“আহা, যদি আমাদেরও একটা কুরবানির পশু থাকত!”

একদিন সন্ধ্যায় সে মায়ের কাছে বলল, “মা, আমরা কি এই বছর কুরবানি দিতে পারব না?” মা মৃদু হাসলেন, কিন্তু চোখে কষ্টের ছাপ।

বাবা, চেষ্টা তো করি, কিন্তু এই বছর সংসারের খরচই অনেক। আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের নিয়ত দেখেন।”

রহিম চুপ করে গেল। তার মন খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু সে মায়ের কষ্ট বুঝতে পারল। সেই রাতে ঘুমানোর আগে সে অনেকক্ষণ ভাবল। তার মনে পড়ল মসজিদের হুজুরের কথা, “কুরবানি মানে শুধু পশু জবাই নয়, বরং নিজের প্রিয় জিনিস আল্লাহর জন্য ত্যাগ করা।”

পরদিন সকালে রহিম নিজের ছোট্ট বাক্সটা খুলল। সেখানে ঈদ সেলামি আর বৃত্তি থেকে পাওয়া কিছু টাকা সঞ্চয় করেছিল একটি সাইকেল কিনবে বলে। টাকাগুলো হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “যদি আমি শখের সাইকেলের জন্য জমানো টাকা দিয়ে আল্লাহর জন্য কুরবানি দিই, তা কী হবে?”

এমন সময় ছোট বোন সুমি এসে জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়া, তুমি কী করছ?”

রহিম হাসল, “একটা ভালো কাজ করতে যাচ্ছি।”

বিকালে সে বাজারে গেল। অনেক কষ্টে তার সঞ্চিত টাকা দিয়ে একটা ছোট কিন্তু শান্ত স্বভাবের ছাগল কিনে আনল।

ছাগলটা বাড়িতে আনতেই সুমি আনন্দে লাফিয়ে উঠল, “ভাইয়া! এটা কি আমাদের?”

হ্যাঁ,” রহিম বলল, “এটাই আমাদের কুরবানির ছাগল।”

মা অবাক হয়ে বললেন, “তুমি এটা কোথা থেকে পেলে?”

রহিম লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল, “আমি সাইকেলের জন্য জমানো টাকা দিয়ে কিনেছি।”

মায়ের চোখ ভিজে উঠল। তিনি কিছুক্ষণ কিছু বলতে পারলেন না।

কুরবানির আগের দিনগুলোতে রহিম আর সুমি ছাগলটাকে খুব যত্ন করল। ওরা তাকে খাওয়াত, আদর করত। ছাগলটাও যেন তাদের পরিবারেরই একজন হয়ে গেল।

সুমি একদিন বলল, “ভাইয়া, এটা তো আমাদের খুব প্রিয় হয়ে গেছেআমরা কি এটাকে কুরবানি না দিলেই পারি?”

রহিম একটু থেমে বলল, “এটাই তো আসল পরীক্ষা, সুমি। যেটা আমরা সবচেয়ে ভালোবাসি, সেটাই আল্লাহর জন্য ত্যাগ করতে হয়।”

ঈদের সকাল এলো। গ্রামের মসজিদে নামাজ পড়ে সবাই কুরবানির প্রস্তুতি নিল। রহিমের মনটা একটু কাঁপছিল, কিন্তু সে দৃঢ় থাকল।

কুরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর রহিম মাংস তিন ভাগ করল। সে নিজেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে গরিবদের হাতে মাংস তুলে দিল। এক বৃদ্ধা দোয়া করে বললেন, “আল্লাহ তোমার জীবন ভরে দিক, বাবা।” এক ছোট ছেলে মাংস পেয়ে হাসতে লাগলসেই হাসি দেখে রহিমের বুক ভরে গেল।

বাড়ি ফিরে মা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আজ তুমি শুধু কুরবানি করোনি, তুমি আমাদের শিখিয়েছত্যাগের আসল মানে কী।”

রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রহিম মনে মনে বলল, “আল্লাহ, আমি ছোট মানুষ, কিন্তু তুমি আমার এই ছোট ত্যাগ কবুল করো।”

সেদিন সে বুঝলকুরবানির আসল আনন্দ পশু জবাইয়ে নয়, বরং অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসিএমপি কমিশনারের সাথে রিহ্যাব চট্টগ্রাম রিজিওনাল কমিটির মতবিনিময় সভা
পরবর্তী নিবন্ধকোরবানির ঈদ