যুদ্ধ শেষ করতে চুক্তিতে সম্মত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

ট্রাম্প বললেন, চুক্তি সই হয়ে গেছে, তবে কিছুই জানায়নি তেহরান যুদ্ধে বড় বিজয় অর্জনের দাবি ইরানের

আজাদী ডেস্ক | মঙ্গলবার , ১৬ জুন, ২০২৬ at ৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ

দীর্ঘ কয়েক মাসের সামরিক সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হামলা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তার পর অবশেষে যুদ্ধ অবসানের পথে এগোলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। উভয় দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপ করা মার্কিন নৌঅবরোধ স্থগিত করা হবে এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালী পুনরায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

স্থানীয় সময় গত রোববার রাতে প্রথমে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ঘোষণা দেন যে, মধ্যস্থতায় পরিচালিত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। এর কিছুক্ষণ পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি এখন সম্পন্ন হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এর পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি এখনও প্রকাশ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, চুক্তির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

তবে ইরান যুদ্ধে ইতি টানতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার চুক্তি ‘পুরোপুরি সই হয়ে গেছে’ বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। জিসেভেন সম্মেলনে যোগ দিতে গতকাল সোমবার ফ্রান্সে পৌঁছার পর তিনি এ তথ্য জানান। তবে ইরান এই চুক্তিতে এখনো সই করেছে কিনা, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। কিংবা ইরানের তরফেও এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো বক্তব্য আসেনি। ট্রাম্প যখন ইভিয়ানলেবাঁ শহরে ব্রিফিংয়ে এ কথা বলছিলেন, তখন পাশে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও ছিলেন। ট্রাম্প বলেন, তেহরানের সঙ্গে একমত হওয়া চুক্তি ‘পুরোপুরি সই হয়ে গেছে’ এবং হরমুজ প্রণালির একটা অংশ ইতোমধ্যে খুলে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবারের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই প্রাথমিক সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, সামরিক অভিযান স্থগিত করা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চুক্তির ভিত্তি তৈরির চেষ্টা চলছে। শান্তি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এঙে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, চুক্তিতে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি ছিল লেবানন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক মহল লেবাননে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। তবে ইসরায়েল ও ইরানসমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিবালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গতকাল সোমবার রাত থেকে লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট সব যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। একইসঙ্গে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়সীমার মধ্যে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বিতর্কিত বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। তিনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, বর্তমান সমঝোতা যুদ্ধ বন্ধের প্রথম ধাপ। আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে। ঘারিবাবাদি বলেন, অশুভ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য যে শত্রুপক্ষ হামলা চালিয়েছিল, তারা তাদের সব লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এই যুদ্ধে বড় ধরনের বিজয় অর্জন করেছে।

রয়টার্সের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে এই ইস্যুটি পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হতে যাচ্ছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া। বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ গত কয়েক মাস ধরে কার্যত বন্ধ ছিল। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, আমি এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো টোল বা বাধা ছাড়াই জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর পূর্ণ অনুমোদন দিচ্ছি এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিচ্ছি। একই পোস্টে তিনি আরও লেখেন, বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেল প্রবাহিত হতে দাও।

তার এই ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। গতকাল সোমবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেঙাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের মূল্য ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পায়। এশিয়ার বিভিন্ন শেয়ারবাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও স্থিতিশীল হতে পারে।

এদিকে চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘অনেক বড়, বিশাল জয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। গত রোববার রাতে তিনি বলেন, এটি যুদ্ধ শেষ করতে যাচ্ছে। এটি অনেক, অনেক বড় একটি জয়। আর এটি সম্ভব হয়েছে কারণ প্রেসিডেন্ট এর পেছনে লেগে ছিলেন। ভ্যান্স বলেন, পশ্চিম এশিয়াকে স্থিতিশীল করার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তার ভাষায়, এই অঞ্চল বহু বছর ধরে বৈশ্বিক উদ্বেগ ও অস্থিরতার কেন্দ্র হয়ে রয়েছে। এখন নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। তিনি আরও দাবি করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক হুমকি দূর করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিম এশিয়ায় সমৃদ্ধির নতুন যুগের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জন্যও ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে বলে মন্তব্য করেন।

তবে চুক্তি ঘোষণার পরপরই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেনগভির স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া কোনো সমঝোতা মেনে চলতে ইসরায়েল বাধ্য নয়। গতকাল সোমবার এঙে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, আন্তর্জাতিক কোনো সমঝোতার জন্য ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তাকে কখনও অবহেলা করবে না। ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। কারণ, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অধীন নয়। আমরা একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র। তিনি আরও বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে ভালোবাসি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু ইসরায়েল কোনো ব্যানানা রিপাবলিক নয়। যে চুক্তি আমাদের নিরাপত্তাকে সুরক্ষিত করে না তার অংশীদার আমরা নই। তাই তা মেনে চলার বাধ্যবাধকতাও আমাদের নেই।

বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থান প্রসঙ্গে বেনগভির বলেন, দেশটির সেনাবাহিনী যে এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে সেখান থেকে তারা সরে আসবে না। যদিও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি, তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, তিনি দ্রুত ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করতে আগ্রহী। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলের উদ্বেগ নিয়ে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে বর্তমান সংঘাতের সূচনা হয়। এরপর ইরান পাল্টা হামলা চালায় ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে। সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত আকার ধারণ করলে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে ইরান হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন বন্দর ঘিরে নৌঅবরোধ আরোপ করে। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। বর্তমান সমঝোতা সেই অচলাবস্থা নিরসনের প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি, লেবাননের পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলের অবস্থানসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ফলে শুক্রবারের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর এবং পরবর্তী আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাকলিয়ায় শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ
পরবর্তী নিবন্ধ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকার সম্পূরক বাজেট পাস