
মোতাহের হোসেন চৌধুরীকে (১৯০৩–১৯৫৬) আমরা জানি ‘সংস্কৃতি কথা’ গ্রন্থের জন্য বা ক্লাইভ বেলের ‘সিভিলাইজেশন’ এর অনুবাদ ‘সভ্যতা’, বার্ট্রাড রাসেলের ‘কনকোয়েস্ট অব হ্যাপিনেস’ এর অনুবাদ সুখ গ্রন্থের জন্য। কিন্তু তিনি তরুণ বয়স থেকে মৌলিক গান ও কবিতা লিখেছেন, আল্লামা ইকবাল সহ বিভিন্ন উর্দু কবিতাও অনুবাদ করেছেন।
মুসলমান সমাজের কুসংস্কার, অন্ধতা, বুদ্ধিহীনতা, কুপমণ্ডুকতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদের উজ্জ্বল সূচিপত্র ছিল তাঁদের হাতে। অন্ধকারকে দূর করবার প্রদীপ্ত ‘শিখা’ ছিল তাঁদের হাতে। আর তাঁরা তাঁদের সম্মিলিত সংঘের নামকরণ করেছিলেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ।’ মোতাহের হোসেন চৌধুরী ছিলেন তাদের অন্যতম। ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন এই শতাব্দীতে বাঙালি মুসলিম সমাজে এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ঘটনা, এবং এর অন্যতম কাণ্ডারী ছিলেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী সৌন্দর্য বৃদ্ধি, যুক্তিবাদ ও মানবপ্রেমই সমাজের পরিত্রাতা শক্তি–এই বিশ্বাসে অটল থেকে তিনি আমৃত্যু মনন ও চিদ্বৃত্তির সাধনা করে গেছেন। ‘মুসলিম রেনেসাঁসে’র অগ্রদূত হিসেবে তিনি সর্বদা প্রশ্নাতীত শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত থাকবেন।
মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে ভাষা সৈনিক মাহবুব–উল–আলম চৌধুরীকে একটা চিঠিতে মোতাহের হোসেন চৌধুরী জানাচ্ছেন, “আমার প্রিয় কবিতা হচ্ছে জীবনানন্দ দাশের ‘অন্ধকার’ আর বুদ্ধদেবের ‘এই শীতে’। কবিতাটা তোমাদের কাছে হয়তো ভালো লাগবে না, কিন্তু আমার কাছে লাগে। এই দুটি কবিতায় রূপায়িত হয়েছে বলে তাদের রসে বুঁদ হয়ে থাকি। অবশ্যি জীবনানন্দ দাশ মরতে চেয়েছেন আর না বেঁচে ওঠার জন্য। আমি মরতে চাচ্ছি বেঁচে ওঠার জন্য। সেই যে বল্লাম নব প্রভাতের তীরে পৌঁছানোর জন্য।” এতে পাঠক মোতাহের হোসেন চৌধুরীর কবি ও ব্যক্তি মনের ক্রাইসিস ও গভীর ক্রন্দন শুনতে পাই। তাঁর মহীয়সী স্ত্রী হুসনুননাহার চৌধুরী স্মৃতিচারণ করে বলছেন, “কিশোরকালে তাঁর শিল্পীসুলভ মনের পরিচয় পেয়ে অনেকে যেমন তাঁকে ‘কিশোর কবি’ বলতেন আবার ‘সৌখিন কবি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
গানের প্রসঙ্গে মাহবুব–উল–আলম চৌধুরী বলছেন, গান না শুনলে তাঁর ঘুম হতো না। সকালে এবং রাতে ঘুমাবার সময় গান শোনা তাঁর চাই–ই। তাঁর একটি গ্রামোফোন এবং অনেক রবীন্দ্র সংগীত রেকর্ড ছিল। ‘সীমান্ত’ অফিসে এবং চন্দনপুরায় বাসকালে ভিড়ের মধ্যে গান শোনার ব্যাঘাত ঘটলে তিনি চকবাজারে একটি নিরিবিলি বাসা ভাড়া নেন।
আমার অনার্স শুরুর সময় চট্টগ্রামের উপর্যুক্ত গীতিময় বাড়িটির সাথে পরিচয় ঘটে ১৯৭৫ নাগাদ। রুমঘাটার একটি ছোট গলি, সরু নদীর মতো নালা’র পাড় দিয়ে গেলে একটি একতলা বাংলো বাড়ি। আর ছোট্ট ড্রয়িং রুমে হারমোনিয়াম, তবলা, বই। হুসনুনের মত মাতৃরূপেন সংস্থিতা, সতীর্থ বিদুষী সেবা চৌধুরী তার বাবার আদর্শে আমাদের কত সময়ে অসময়ে গান শুনিয়েছেন। তারপর ২৫টি বছর কাটলে আমরা যখন জানলাম আরেক বিস্ময় এই দার্শনিক গদ্যকার কবিতা ও গান লিখেছেন। আর তখনই এই গ্রন্থ সম্পাদনার সূত্রপাত।
নজরুল যখন চারণের বেশে দিকে দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন; নতুন কথায়, প্রাণের বন্যায় ভরিয়ে দিচ্ছেন সারাদেশকে; নবীন চেতনার দ্বারা সনাতনপন্থীদের মনে ও হৃদয়ে ভয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি করছেন ঠিক সে সময়ে মুসলমান সমাজের একটি স্থিতধী তরুণ দল, বৃদ্ধির মুক্তির আন্দোলন স্থির–প্রতিজ্ঞ হয়ে, অভীষ্ঠ পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
আনিসুজ্জামান অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, মোতাহের হোসেন চৌধুরী সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন কবিতা লিখে এবং তিনি দীর্ঘকাল কবিতা রচনা অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত না হওয়ায় তাঁর কবিতার বিকাশ ও পরিণতি সম্পর্কে কোন স্থির সিদ্ধান্তে আশা দুষ্কর।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলাম উভয়েরই প্রভাব পড়েছিল মোতাহের হোসেন চৌধুরীর কবিতায়। ‘যাত্রা সঙ্গীত’ নামে তাঁর যে কবিতা তাতে ‘বলাকা’ পর্বের রবীন্দ্রনাথের ভাব ও ভাষার কিছু প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাবে। ‘কড়ি ও কোমল’ ‘মানসী’ বা ‘চৈতালী’ পর্বের রবীন্দ্রনাথের প্রভাব দুর্লক্ষ্য নয়;/ এ আকাশ, এ আলোকে, চন্দ্র–সূর্য–তারা,/ নৃত্যপরা এ মোদের সুন্দর ভুবন/ শিরায় শিরায় ঢালে আনন্দের ধারা,/ চোখের তারায় আনে সোনার স্বপন।/ [‘কবি’]
অন্যদিকে ‘শুধু মোর ক’টি গান’ নামে যে–কবিতাটি পরে উদ্ধৃত করেছি, তার ভাব ভাষা নজরুলকে স্মরণ করিয়ে দেয়, এমন কি, কোথাও কোথাও হয়তো জসীমউদ্দীনকেও : লতা–পাতা সব দোলায়ে দোলায়ে বাতাস বহিছে ধীরে/ বাতাসের বায়ে শিহর জাগিছে, নদীর কাজল নীরে।/ চাঁদের অমিয়া পান করে ঐ রাত–জাগা এক পাখী,/ আধ ঘুমে আর আধ জাগরণে উঠিতেছে ডাকি’ ডাকি’।
এমন কথা বলাও হয়তো অসংগত হবে না যে, তাঁর কবিতায় তিরিশের কবিদের কারো কারো ভাব ও ভঙ্গিও খুঁজে পাওয়া যাবে : আজ রাতে মোরা ঘুমাব না, সখি, জাগিয়া র’ব,/ ছিপ্ছিপে তব হাতখানি দাও আমার হাতে;/ ফিস্ফিস্ ক’রে কানে কানে দোঁহে কথা যে ক’ব,/ মনের গহনে স্বপন রচিব কথার সাথে।/ বন–মর্মর শুনেছি গোপন মনের মাঝে;/ উতলা রজনী, আজ কি মোদের ঘুমান সাজে। [‘উতলা রজনী’]
‘উতলা রজনী’ নামটিই বুদ্ধদেব বসুর সেই বহুবিতর্কিত গল্প ‘রজনী হল উতলা’ স্মরণ করিয়ে দেয়, আর যা আশ্চর্যজনক বলে মনে হয়, তা এই যে, এই কবিতার ভঙ্গি কল্লোল–বিরোধী রজনীকান্ত দাসের কবিতার সঙ্গে মেলে।
স্বভাবত তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট। কিন্তু সেই সঙ্গেই তিনি ছিলেন বিচারশীল–তাঁর সৌন্দর্যবোধ আর বিচারশীলতা তুল্যরূপে বিকশিত হয়ে চলে। তার ফলে কিছু ভালো কবিতা লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভবপর হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রতিষ্ঠা দাঁড়ায় জীবন–জিজ্ঞাসু প্রাবন্ধিকরূপেই। তাঁর সেই জীবন–জিজ্ঞাসার মর্যাদা নিরূপণের চেষ্টা পরবর্তীতে বিশেষভাবেই করতে হবে–এমনি ক’রেই উন্নীত হয় সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক মান–আর সেই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হলে তাঁরা হয়ত বিস্মিত হয়ে দেখবেন, যে সমাজে ও কালে মোতাহের হোসেনের জন্ম হয়েছিল সেই দুইয়েরই অধিকাংশ ও বিচ্যুতির বেদনা কত তীব্রভাবেই তাঁতে বেজেছিল– সেই বেদনার রসায়নে তাঁর সৌন্দর্য–পূজা হয়ে ওঠে জীবন জিজ্ঞাসা।
কবিতায় চৌধুরী অনন্য ও একক কারো সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে যান না, বক্তব্যের ব্যাপারে স্থির ও পৃথক বিশ্বাসে বলীয়ান এবং সত্যনিষ্ঠ, কবিতার ক্ষেত্রেও তিনি তেমনি অনন্য ও উদার। সেখানেও তাঁর পরিচ্ছন্ন হৃদয় ও সুন্দর অন্বেষার পরিচয় স্ফুট।
মোতাহের হোসেনের মানসলোকে প্রমথ চৌধুরীর প্রভাব সুস্পষ্ট এবং এ কারণেই হয়তো তাঁর মতোই রোমান্টিক কাব্য রচনার চাইতে ‘সনেট’ রচনাতেই তিনি মুক্তি খুঁজেছেন বেশি। দীন আমি, দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়া বেড়াই/ আনন্দ–কণিকা মাগি। কোথা নাহি পাই/ সে পরম ধনটুক; তাই নিশিদিন/ প্রাণ মোর রহে শুষ্ক মধু ছন্দহীন। [‘চতুর্দশপদী’]
সত্যি বলতে কি, কবিতা ব্যতীত জীবনকে ভোগ করা গেলেও, উপভোগ করা যায় না। বলাবাহুল্য, মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাঁর নিজস্ব চিন্তা–চেতনাকে আরো বহুদূর দিগন্তব্যাপী ছড়িয়ে দেবার জন্যেই কবিতা ও গান রচনার মাধ্যমটি বেছে নিয়েছিলেন। এই প্রার্থনায় স্পষ্টতই মোতাহের হোসেন চৌধুরীর সংস্কৃতিবান হওয়ার মানে ‘প্রেমবান’ হওয়ার কথা অলক্ষ্যে মর্মরিত হয়ে উঠেছে। ‘আজ নয়’ কবিতাটিতেও প্রায় একই সত্য ঝিলিক দিয়ে ওঠে, তবে একটু ভিন্নভাবে।
‘শরতে’ কবিতাটিতেও কবির আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে তার ইঙ্গিত, অত্যন্ত স্পষ্ট, ঋজু। প্রতীকধর্মী কবিতাটি সুন্দর। ‘কবি’ শীর্ষক কবিতাটিতেও কবির প্রেম ও আনন্দের ছায়া বাণীমূর্তি লাভ করেছে। “আমি কবি, সুন্দরের গাহি জয় গান।”
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে: ফাল্গুন প্রাতে (সওগাত, ফাল্গুন, ১৩৪১), বিতরণ (দীর্ঘ কবিতা, ১৩৩৯), শীতের কোকিল (অপ্রকাশিত), বাঁশরির খেদ (সুদীর্ঘ কবিতা), বনের ডাক (সওগাত আশ্বিন, ১৩৪১) ও সুখ (সওগাত, ভাদ্র, ১৩৩৯)। অভিযান, প্রবাসী, বুলবুল, ছায়াবীথি, মাসিক মোহাম্মদী, সওগাত, বিচিত্রা, মাহেনও, সমকাল প্রভৃতি কাগজে তাঁর অনেক কবিতা পত্রস্থ হয়েছে। কবি ছান্দসিক আবদুল কাদির সম্পাদিত ‘কাব্য মালঞ্চে’ ও তাঁর কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়। এর মধ্যে কিছু কবিতা ইংরেজী ভাষায়ও অনূদিত হয়। মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ বলেন–মোতাহের হোসেন চৌধুরীর কবিতায় রোমান্টিক স্বপ্ন–কল্পনা, সৌন্দর্য–চেতনা, প্রকৃতি প্রেম ও মানবিক কল্যাণবোধ রূপ পেয়েছে।
আবুল ফজল বলেন, ভাষায়, ভাবে ও আঙ্গিকে এই কবিতায় তিনি সর্বাধুনিকদেরও পুরাভাগে এসে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু তাতেও তাঁর রোমান্টিক কবি–সুলভ সৌন্দর্যকল্পনা ব্যাহত হয়নি কিছুমাত্র। এই কবিতায় অর্থাৎ গদ্য কবিতায়ও মোতাহের হোসেন চৌধুরীর হাত ছিল চমৎকার। লিখেছেনও কয়েকটি অনবদ্য গদ্য কবিতা।
এখানে বলা দরকার, প্রথম গানটি ‘বরণ গীতি’ এবং দ্বিতীয়টি ‘বাদলের গান’ (বিদায় গীতি) নামে ‘মাসিক মোহাম্মদী’তে পত্রস্থ হয় ১৪শ বর্ষ ১০ম সংখ্যা ও ১৫শ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায়। লক্ষণীয় যে, গানেও মোতাহের হোসেন চৌধুরীর প্রেম, সৌন্দর্য ও আনন্দ–বেদনা লাফিয়ে উঠেছে ঘাস ফড়িং এর মতো।
মোতাহের হোসেন চৌধুরীর ব্যতিক্রমধর্মী উজ্জ্বল একটি গানের সন্ধান পাওয়া যায় ‘কিষাণের গান’ নামে। এটি সম্ভবত মাসিক ‘সওগাত’ পত্রিকায় পত্রস্থ হয়েছিল। সেখানে এই গানটির একটি শব্দের প্রয়োগ নিয়ে সম্পাদক পাদটীকায় আপত্তি তুলেছিলেন এইভাবে যে, ‘লক্ষীরাণী; শব্দটি আমাদের মতে আপত্তিকর। দেখবেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী কোথায়, কিভাবে তাঁর ‘কিষাণের গানে’ এই আপত্তিকর শব্দটি প্রয়োগ করেছিলেন। এ–সঙ্গে গানটিও উপভোগ করবার সুযোগ ঘটবে পাঠকদের। নজরুলের প্রভাব রয়েছে এখানে। ২০০২ সালে অভীক ওসমান ও সেবা চৌধুরী সম্পাদিত মোতাহের হোসেন চৌধুরী গান ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশ প্রাচীন প্রকাশক স্টুডেন্ট ওয়েজ অচিরেই নতুন প্রচ্ছদ দিয়ে প্রকাশ করতে যাচ্ছে। পাঠক এতে নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলাম, ভাষা সৈনিক মাহবুব–উল–আলম চৌধুরী, কবি পত্নি হুসনুন নাহার চৌধুরী কবি তনয়া জাকিয়া হোসেন, নুর মোহাম্মদ রফিকের লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার। পরিচালক, থিয়েটার ইনস্টিটিউট–চট্টগ্রাম।











