দীর্ঘ প্রায় দুই সপ্তাহের অনিশ্চয়তা ও তীব্র সংকটের পর মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে আবারও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। গত বুধবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে টার্মিনালটি পুনরায় চালু হলেও শুরুতে সরবরাহ সীমিত রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে প্রতিদিন প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে তা ২০০ মিলিয়ন, ৩০০ মিলিয়ন এবং শেষ পর্যন্ত টার্মিনালটির পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, টার্মিনালটি পুরো সক্ষমতায় না ফেরা পর্যন্ত দেশের গ্যাস পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না। তবে সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়ায় চট্টগ্রামসহ দেশের শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) একজন কর্মকর্তা জানান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে টার্মিনালটির উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হবে। গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট পরিচালিত ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডের পরই এলএনজি পুনর্গ্যাসীকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে একদিনেই প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট পুনর্গ্যাসীকৃত এলএনজি সরবরাহ করে থাকে। একটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের গ্যাস সেক্টরে ভয়াবহ রকমের চাপ পড়ে।
এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে। কর্ণফুলী, কালুরঘাট, পতেঙ্গা, সীতাকুণ্ড, কুমিরা, ভাটিয়ারী, ফৌজদারহাট এবং চট্টগ্রাম ইপিজেড এলাকার অসংখ্য শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ নেমে যায় আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হয়, কোথাও কোথাও কয়েকটি শিফট বাতিল করা হয়। বিশেষ করে ইস্পাত, রি–রোলিং, কাচ, সিরামিক, টেঙটাইল, স্পিনিং, ডাইং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রাসায়নিক শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হয়। একাধিক কারখানা ব্যয়বহুল ডিজেলচালিত বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালিয়ে গেলেও উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ে। গ্যাসনির্ভর কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে হয়েছে। পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক স্থানে দীর্ঘ সারি দেখা দেয়। আবাসিক এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ একেবারে তলানিতে নেমে যাওয়ায় চুলা বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে।
সূত্র বলেছে, দেশে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যেকোনো একটিতে সাময়িক সমস্যা দেখা দিলেও তার প্রভাব সরাসরি জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রাম পুরোপুরি আমদানিকৃত এলএনজি নির্ভর হওয়ায় ভাসমান টার্মিনালে কোনো সংকট হলে শুরুতেই তার বড় ধাক্কাটা চট্টগ্রামে লাগে।
জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা আশা করছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ আরও বাড়লে চট্টগ্রামসহ দেশের শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে এবং গত দুই সপ্তাহের অচলাবস্থা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করবে।












