ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় লণ্ডভণ্ড লবণ মাঠ

৪২ হাজার চাষি কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত

শাহেদ মিজান, কক্সবাজার | শুক্রবার , ১ মে, ২০২৬ at ৯:৪৪ পূর্বাহ্ণ

ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চলে লবণ মাঠের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে লবণ মাঠ। সেই সাথে কূলে থাকা ব্যাপক লবণ গলে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে বৃষ্টির জলে মাঠ ডুবে যাওয়ায় লবণচাষ আর না হওয়ার কথা জানিয়েছেন চাষিরা। এতে হতাশ হয়ে পড়েছেন তারা।

বিসিক’র তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে কঙবাজার জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, পেকুয়া, চকরিয়া ও সদরের বিস্তীর্ণ প্রায় ৬৮ হাজার ৫০০ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত রোববার থেকে বৈরি আবহাওয়া শুরু হয়। এর মধ্যে মঙ্গলবার ও বুধবার প্রবল বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। এসময় মাঠে থাকা বিপুল লবণ ভেসে যায়। আর লন্ডভন্ড হয়ে গেছে পলিথিনসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি।

অন্যদিকে বৃষ্টি থামলেও পানিতে ডুবে রয়েছে লবণ মাঠ। ফলে চাষ আর না হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এতে চাষের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪২ হাজার চাষি কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর আগেও বৈশাখের শুরুর দিকে বয়ে যাওয়া ঝড়ো হাওয়ার সাথে বৃষ্টিতে সব এলাকায় লবণ উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে। দুই দফায় বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হলেন চাষিরা। একদিকে ন্যায্যমূল্য নেই, অন্যদিকে বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে টানা গত কয়েক বছরের মতো এবারও লোকসান নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে চাষিদের।

টেকনাফের চাষি ছলিম উল্লাহ জানান, ৭ ও ৮ এপ্রিলের পর আবার প্রবল বৃষ্টিতে লন্ডভন্ড হয়ে লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদিত লবণও বিক্রি করা যায়নি। মাঠে থাকা লবণ ছাড়াও জমানো লবণও বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে। এরপর পলিথিন গুছিয়ে মাঠ তৈরি করতে গেলে হয়তো যে কোনো সময় আবারো বৃষ্টি নেমে মাঠ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরেক চাষি আবদু জলিল বলেন, বহু বছর ধরেই লবণের ন্যায্যমূল্য নেই। প্রতিবছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছি। তারপরও পেটের দায়ে চাষ করতে হচ্ছে। চলতি বছরও একই দশা দিয়ে উৎপাদন করে এসেছি। এবার এক মণ লবণ উৎপাদন করতে খরচ হচ্ছে ২৯০ টাকা। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা। লোকসান দিয়ে আর কত লবণ বিক্রি করা যায় বলেন। তার সাথে বৃষ্টির প্রভাব।

মহেশখালীর চাষি খোরশেদ আলম বলেন, গত অগ্রহায়ণ মাস থেকে লবণ উৎপাদন শুরু করি। চৈত্র পর্যন্ত একর প্রতি লবণ উৎপাদন হয়েছে সর্বোচ্চ ৪৫০ মণ লবণ। এখন পর্যন্ত লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করেছি। কিন্তু এখনো রয়েছে গেছে দাদনের টাকা। এখন যে পরিমাণ লবণ মজুদ রয়েছে এবং সামনে যা উৎপাদন হবে তাতে দাদনের টাকা উঠবে না। এরপর সংসার কিভাবে চলবে?

কুতুবদিয়ার চাষি শহীদুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ বৃষ্টি এসে আমাদের স্বপ্ন ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। হাতে আছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিন। এর মধ্যে আবারো কালবৈশাখীবৃষ্টি হতে পারে। একবার বৃষ্টি হলে ৭ থেকে ৮ দিন লবণ উৎপাদন বন্ধ থাকে। এতে বাকি সময়টা পুরোপুরি অনিশ্চিত। তাই অনেকে আর চাষে নামতে চাচ্ছে না।

লবণচাষি সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দীন জানান, নভেম্বরডিসেম্বর মাসে ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহ থাকার কারণে উপজেলার লবণচাষিদের মাঠে নামতে ২০ থেকে ২৫ দিন দেরি হয়েছে। এখন আবার বৈরী পরিবেশের কারণে ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। এ কারণে লবণ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। অধিকাংশ চাষি ঋণ ও দাদনের টাকায় লবণ চাষে নামেন। লবণ উৎপাদন কম হওয়ায় ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। তিনি বলেন, ডিসেম্বরজানুয়ারি মাসে লবণ বিক্রি হয়েছে ১৯০ থেকে ২১০ টাকায়। মার্চের মাঝামাঝিতে এসে লবণের দাম কিছুটা বেড়ে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা হয়। সার্বিক পরিস্থিতি অনুসারে দাম অন্তত প্রতি মণ ৪০০ টাকা হওয়া উচিত।

এদিকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত) কঙবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণের চাষ হয়েছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত লবণ উৎপাদিত হয়েছে ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২ মেট্রিক টন, যা গত মৌসুমের (একই সময়ে) তুলনায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন কম। গত মৌসুমে একই সময়ে লবণ উৎপাদিত হয়েছিল ১৮ লাখ ২২ হাজার ১৬২ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। দেশে লবণের চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন।

লক্ষ্যমাত্রার কম লবণ উৎপাদনের কারণ জানতে চাইলে বিসিকের কঙবাজার লবণ উন্নয়ন প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী বলেন, দুই দফার ভারী বৃষ্টিতে শতভাগ লবণমাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পর থেকে লবণ উৎপাদন বন্ধ আছে। বৃষ্টির পানিতে শত শত চাষির লবণ গলে নষ্ট গেছে। লবণ উৎপাদনে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিসিক কঙবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া। তিনি বলেন, বর্তমানে মাঠ ও মিল (কারখানা) পর্যায়ে নতুনপুরোনো মিলে ১০ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন লবণ মজুত রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআগামী দুই বছর কঠিন হবে, অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে
পরবর্তী নিবন্ধসংবিধান পছন্দ না হলে আন্দোলন করতে পারি, বিদ্রোহ নয় : সংসদে শফিকুর