বোকাবাক্সতে বন্দি

সামিহা খায়ের | শনিবার , ১৬ মে, ২০২৬ at ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ

টেলিফোনের যুগ ছেড়ে ইন্টারনেটের যুগে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি আমরা বেশ অনেক বছর হলো। পৃথিবীটা সত্যিই ছোট হতে হতে হাতের মুঠোর সমান বোকাবাক্সে বন্দি হয়ে এসেছে। সেখানে বহুবিধ আলাপ চলছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এমনকি সামাজিক নির্ভরতার জায়গাও হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট। মনের ভাব আদানপ্রদান থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই হারে ইন্টারনেটকে ব্যবহার করা হচ্ছে। উন্নতির পথে হাঁটতে গেলে নিশ্চয়ই এমন বিভিন্ন প্রয়োজনের কথাই বারবার উঠে আসবে। তবে অন্ধকারও এই জগতের আরেক পরিচয়। যার আলোচনায় এখন সকলেই উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে প্রশ্নটি যখন শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা।

জেনজি বা জেনারেশন জি ও জেনারেশন আলফাদের জন্য সম্ভবত অনলাইনের দুনিয়াটাই বেশি স্বচ্ছন্দ্যের। পড়ালেখা হোক বা বিনোদন, বন্ধুদের সাথে আড্ডা অথবা কোন স্কিল শিখতে চাওয়াইন্টারনেট এখন শিশু কিশোরদের জন্য অন্যতম সুলভ মাধ্যম। সব ভালোরই কিছু মন্দ দিক থেকেই যায়। এক্ষেত্রে বাবা মা হিসেবে অনেকেরই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠে শিশু কিশোরদের অতিরিক্ত ও অসচেতন ইন্টারনেট ব্যবহার। গেইম ও পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম অসামাজিক কর্মকান্ডে নিজেদের জড়িয়ে ফেলার প্রবণতা আরও তীব্র হয়ে উঠছেএতে কোন সন্দেহ নেই। শিশু কিশোররা নানাভাবে এর ভুক্তভোগী। কখনো জড়িয়ে যাচ্ছে সাইবার ক্রাইমের মতো অপরাধের সাথে, আবার কখনো নিজেরাই হয়ে উঠছে শিকার। ২০২৩ সালের মে মাসে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিক্যাফ) প্রকাশিত “বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ প্রবণতা ২০২৩” শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে সাইবার অপরাধে শিশু ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেড়েছে দেড়গুণের বেশি। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী ফেইসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলো ব্যবহারের মধ্য দিয়েই শিশুরা বিভিন্ন সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে শিশুদের কোনরকম সাইবার সচেতনতা না থাকা এ ধরনের অপরাধের সাথে জড়ানোর প্রধান কারণ। ঠিক যতোটা উন্মুক্ত জগৎ ঠিক ততটুকুই অনিরাপদ হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট। ২০১৯ সালে ইউনিসেফের অনলাইন সেফটি অব চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩২ শতাংশ শিশু সাইবার হয়রানির মুখে পড়ছে।

চাইল্ড পর্ণোগ্রাফিতে ফেইসবুক, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম সয়লাব। বিভিন্ন গ্রুপে চলছে শিশু কিশোরদের নিয়ে নানারকম অপ্রীতিকর পোস্ট আর অহরহ কমেন্ট। এমনকি শিশুদের ব্যক্তিগত ছবি তুলে আপলোড দেওয়াও একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজে দুই চারজন মানসিক বিকারগ্রস্ত অপরাধীকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া যায়। কিন্তু এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সাথে মানুষের যে সংখ্যাটি জড়িত, সেটি মোটেও কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। ঘটনাগুলো শুধু বাংলাদেশের বেলাতেই সত্যি, এমনটাও না। পুরো পৃথিবীজুড়েই শিশুদের প্রতি এধরনের প্রতিহিংসামূলক আচরণ বেড়ে চলেছে। স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইল্ডলাইট গ্লোবাল চাইল্ড সেফটি ইনস্টিটিউটের করা এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ তথ্যবছরে প্রায় ৩০ কোটি শিশু অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হয়। শিশুদের সাথে যৌনতাবিষয়ক আলাপ কিংবা যৌন কার্যকলাপের অনুরোধ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে ডিপফেক ছবি ও ভিডিও তৈরি, ব্যক্তিগত ছবি ধারণ ও তারপর তা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করাশিশুদের নিরাপত্তা যেন তাসের ঘরের মতোই ভঙ্গুর। চাইল্ডলাইটের প্রধান নির্বাহী পল স্ট্যানফিল্ডের ভাষ্যমতে, এটি একটি স্বাস্থ্য মহামারী। নিঃসন্দেহে এটি মানসিক বিকারগ্রস্ততার শেষ পর্যায়।

নথিপত্রের ভাষা ছেড়ে যদি সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে গল্প বলা যায়, তাহলে দেখা যাবে প্রতিনিয়ত প্রায় প্রতিটি ঘরেই শিশুরা অনলাইনে নানারূপ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কারণ হিসেবে আমরা এক কথায় বলে দিচ্ছি, মানসিক বিকারগ্রস্ততা। যদি শুধুমাত্র তাই হয়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ আশঙ্কাজনক। কেননা সংখ্যাটি এক বা দুই ডিজিটের নয়। হাজার হাজার মানুষ নানান প্ল্যাটফর্মে গ্রুপ বানিয়ে শিশুদের নিয়ে নিজেদের বিকৃত যৌন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ ও প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তারচেয়ে ভয়ঙ্কর কথাটি সম্ভবত এই যে, অনেক সময় শিশুটির কাছের মানুষজনই ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে এসকল সামাজিক মাধ্যমগুলোতে শেয়ার করেন। ২০২৪ সালে দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত একটি সংবাদে রাজশাহীর এক স্কুল শিক্ষকের ঘটনা উঠে আসে, যেখানে তিনি তার ছেলে শিক্ষার্থীদেরকে যৌন হয়রানি করার পর তার ভিডিও সেইভ করে রাখতেন এবং এ ঘটনা চলছিল প্রায় এক যুগ ধরে। শিক্ষক যেখানে আমাদের অন্যতম নিরাপদ এক স্থান হয়ে উঠার কথা ছিল, সেখানে তাই যেন এক নিঃশ্বাসে ধ্বংস করে দিচ্ছে নিষ্পাপ শিশুমন। শুধুমাত্র শিক্ষক নয়, নিজের পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমেও যৌন হয়রানি এবং অনলাইন হেনস্তার শিকার হওয়ার নজির কম নয়। ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক সার্ভেতে দেখানো হয়, ৩৬% মেয়ে শিশু তাদের বন্ধুদের দ্বারা অনলাইনে হেনস্তার শিকার হয়। ২৭% শিশু তাদের প্রাপ্তবয়স্ক আত্মীয়দের দ্বারা এবং ১৮% শিশু অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়। দিনশেষে সব সার্ভে, গবেষণাই কিছু সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এগুলো কোন সাধারণ সংখ্যা নয়। এগুলো আমাদের সমাজের এক ভয়ঙ্কর বাস্তব চিত্র, যার দিকে আঙুল তুলে চোখে চোখ রেখে কথা বলার স্পর্ধা আমাদের নেই। আমরা শিশুদের আর্তনাদকে ধামাচাপা দেই সামাজিক লাঞ্ছনার ভয়ে। শিশুদের মনন, বিকাশ ও স্বাভাবিক পদচারণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে “লোকে কি বলবে” জাতীয় আলাপ।

তবুও আমরা সমাধানের কথা বলি। সমাধানের পথ সুগম হওয়ার প্রথম শর্তই হলো এই যে, আমাদের শিকার করতে হবে সমস্যাগুলো কোথায় হচ্ছে। আমাদের মেনে নিতে হবে শিশুদের নিরাপত্তার ঘাটতি আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি। বাবা মায়ের সঠিক সচেতনতা এবং সন্তানদের অনলাইন সম্পর্কে সঠিক তথ্য ও নিরাপদভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনার অভাব শিশুদের নিরাপত্তাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। শিশুকিশোরদের তাদের বাড়ন্ত বয়সের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সঠিক তথ্য প্রদান করতে হবে। এছাড়াও দেখা যায়, শিশুদের ‘না’ বলতে না পারার সুযোগ নেয় এ ধরনের অনলাইন ও অফলাইন হেনস্তাকারীরা। আমাদের সমাজে শিশুদের ‘না’ বলাটা বড়দের জন্য এখনও বেশ অসম্মানজনক কোন শব্দ হিসেবেই ধরা হয়। তারা কিছুতেই নিজেদের অপছন্দ বা অনিচ্ছাকে প্রকাশ করতে পারবে না, যদি এমন করে তাহলে সে তার পরিবারের চোখে ভালো ছেলে বা ভালো মেয়ে হয়ে উঠতে পারবে নাএই ধারণাটি যে শিশুদের জন্য কি পরিমাণ ভয়াবহ হতে পারে, তার আন্দাজ এখনও এ সমাজের নেই। বাবা মা কে অবশ্যই শিশুদের ‘না’ কে গুরুত্ব দিতে হবে, “না” বলা শেখাতে হবে। তার মতামত প্রকাশ করার একটি নিরাপদ স্থান হয়ে উঠতে হবে। শিশুর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা এবং তার নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়াই আমাদের কাজ। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একত্রে কাজ করে যেতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। শিশুদের অনলাইন কার্যক্রম সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি অপরাধীকে শনাক্তকরণ ও আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এর একটিও যতোদিন সঠিকভাবে পালন করা হবে না, ততোদিন আমাদের শিশুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।

পৃথিবী নিশ্চয়ই আমাদের সবার। আর সবার চেয়ে একটু বেশি শিশুদের। বোকাবাক্সের বদ্ধ কুঠুরিতে আলো পৌঁছে দেওয়া হোক। শিশুদের অম্লান হাসি আমাদের শীতল পৃথিবীতে বসন্ত নিয়ে আসুক। আর সেই পথটুকু নিরাপদ করার দায়িত্ব হোক আমাদের।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএসডিজি গোল, জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন
পরবর্তী নিবন্ধপটিয়ায় কিশোর গ্যাংয়ের ৫ সদস্যসহ গ্রেপ্তার ৯