বৃদ্ধাশ্রমের বিকল্প ভাবনা প্রসঙ্গে

মুশফিক হোসাইন | শুক্রবার , ৩১ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ

বার্ধক্যে এসে রোগে শোকে বয়সের ভারে শরীরকে ক্লান্ত দুর্বল ও অক্ষম অবসন্ন করে তুলে। বর্তমানে সমাজে একক পরিবারের সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। প্রবীণগণের পারিবারিক সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা ও বাড়ছে। বার্ধক্যে তারা অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সময়ে খড় কুটোর মতো যে কোন অবলম্বন আঁকড়ে ধরে আশ্রয় খোঁজে, বাঁচতে চায়। যেহেতু আমাদের সমাজ প্রবীণবান্ধব নয়। তাই বার্ধক্যে তাদের কঠিন ও বৈরী সময়ের মুখোমুখি হযতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।

বাংলাদেশ জনসংখ্যা বহুল উন্নয়নশীল দেশ। শিক্ষা অর্থনীতিতে স্বনির্ভর নয়। তবে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন সূচকে উন্নতির কারণেই মাতৃমৃত্যু হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান, প্রবাস গমনের ফলে মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি হচ্ছে। সহজলভ্য চিকিৎসা সুবিধায় মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে আয়ু ৭২ প্লাস। সর্বশেষ ২০১১ সালের জনশুমারিতে দেশের জনসংখ্যা প্রবৃত্তির হার ৬.১০ শতাংশ। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল ধারণা ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রবীণদের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা। বিশেষজ্ঞদের অভিমত ২০৪৭ সালে বাংলাদেশ জাপানের মতো প্রবীণ সমাজে রূপান্তরিত হতে পারে!

বাস্তবতা এই আমাদের প্রবীণগণ অবহেলিত, অধিকার বঞ্চিত। দেশে প্রবীণদের সামাজিক অধিকার সুরক্ষার্থে নীতিমালা, পিতা মাতার ভরণপোষণ আইন ২০২৩ এবং বয়স্ক ভাতার প্রচলন আছে। আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। আবার বয়স্ক ভাতা ও সর্বজনীন নয়। দেশের শিক্ষা কারিকুলামে বয়স্কদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা বিষয়ক শিক্ষাসূচি অন্তর্ভুক্ত নেই। সামাজিক জীবনাচরণে প্রবীণদের সুরক্ষা দেওয়ার প্রবণতা নেই বললেই চলে।

অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিতে যৌথ পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছেন। একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একক পরিবারের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলছে।

আবার সংসারের প্রয়োজনে পরিবারের কর্মক্ষমদের স্বাচ্ছন্দার্থে কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকতে হয়। এমতাবস্থায়, পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা একা হয়ে যায়। অথচ জীবন সায়াহ্নে এসে তারা নিকট আত্মীয়ের সঙ্গ, আদর ও মমতা কামনা করেন। বার্ধক্যের রোগব্যাধি, একাকীত্ব ও অর্থ সংকট এবং জরায় আক্রান্ত হয়ে অসহায় জীবনযাপনের বাধ্য হন। এই কঠিন সময়ে তাদের মৃত্যুর প্রহর গুণে বেঁচে থাকতে হয়। বলা চলে, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। বাস্তবতা হলো এই সুন্দর ভুবনে কেবা চাহে মরিতে! মানুষ মাত্রই শান্তিময় মৃত্যু প্রত্যাশী। মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা এই কঠিন সময়ে প্রবীণগণ দু’দণ্ড শান্তি নিয়ে বাঁচতে চায়। কামনা করে শান্তিময় মৃত্যু। অতএব এই কঠিন সময়ে গল্পগুজব হাসি তামাশার লোকজন, সমমনা বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনদের খোঁজ করে। কিন্তু সবাই তো যার যার কাজে ব্যস্ত। সময় দেয়ার নেই অবসর। অথচ প্রবীণরাই একসময় পরিবার সমাজ দেশ ও জাতির জন্য সময় শ্রম ও মেধা দিয়েছিলেন। বাস্তবতা হলো প্রবীণদের সাথে কেউ সময় কাটাতে চায় না। আগ্রহী নয়। জানতেও চায় না তারা কেমন আছেন!

বিভিন্ন কারণে সকল প্রবীণদের বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠে না। আবার বৃদ্ধাশ্রম সকল সমস্যার সমাধানও নয়। আর্থিক সংকটও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। প্রবীণদের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানে রেখে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য এবং সংবেদনশীল পরিচর্যায় রেখে বাকী জীবন প্রশান্তিময় সমাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া সর্বোত্তম পন্থা। যেখানে তারা গল্প গুজব, হাসি তামাশা, আনন্দফুর্তি হৈচৈ সময় অতিবাহিত করতে পারবেন।

এই ধ্যানধারণাকে সামনে রেখে প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য পহেলা জানুয়ারি ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘প্রবীণ নাগরিক ফোরাম চট্টগ্রাম’। ফোরাম নানা কার্যক্রম যেমন সভা, পারস্পরিক মতবিনিময়, আড্ডা, সেমিনার, বনভোজ, সম্মাননা প্রদানসহ নানাবিধ কার্যক্রমে চলমান। ২০২৫ সালে অক্টোবর মাসে ৯২ মোমিন রোডে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘প্যারেন্টস লাউঞ্চ’। ছড়াকার আলেক্স আলীমের ছড়া উল্লেখ করা যেতে পারে। “বুড়াঅক্কল বুড়া নঅয়/তারা বেজ্ঞুন গুরা/ হাডি হাডি যাইবোগই চন্দনপুরা/এক ফালদি উঠি যাইবোগই হিমালয়ের চূঁড়া।” বলা চলে ফোরামের স্বপ্ন হলো আকাশ ছোঁয়ার। ‘প্যারেন্টস লাউঞ্চে’ প্রবীণবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। কোন ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়। বরঞ্চ সেখানে প্রবীণদের মধ্যে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা জাগরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে যে যে সুবিধাগুলো আছে তা হল, আভ্যন্তরীণ খেলাধুলা, পাঠাগার, বড় স্ক্রিনের টিভি, ওয়াইফাই, আইপিএস, হালকা ব্যায়ামের সুব্যবস্থা। এছাড়াও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ও হালকা চিকিৎসা সরঞ্জামাদি রাখা হয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত খোলা রাখা হয়। আনন্দময় আচার ব্যবহারের সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নামাজের সময় তারা জামাত সহকারে নামাজ পড়ার সুযোগ পান।সদস্যদের চিনি ছাড়া লিকার চা ও বেলা বিস্কুটের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আছে। সেমিনার, সভা, হেলথ চেকআপ, নববর্ষ, ঈদ পুনর্মিলনী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস সহ কাঁঠাল উৎসব, কাঁচা আম খাওয়া উৎসব, গজল ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন থাকে। দেশীয় ও অপ্রচলিত খাবারদাবারের ব্যবস্থা এবং বাঙালি ঐতিহ্য ও গ্রামীণ খাবারগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। যাতে করে প্রবীণরগণ তাদের শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করতে সমর্থ হন। বাবুর্চি নিয়োগ দেওয়া আছে। বিশ্রামের জন্য তিন বেডের একটি এসি বিশ্রামাগারে ক্লান্ত অবসন্ন প্রবীণগণ বিশ্রাম নিতে পারেন। ওভেন, ফ্রিজ, ডাইনিং টেবিল, সমৃদ্ধ ক্রোকারীজ ও আসবাবপত্র রাখা আছে। জীবাণুমুক্ত হতে নিয়মিত হাত ধৌতকরা বাধ্যতামূলক। যাকে প্রবীণবান্ধব ক্লাবঘর বলা যেতে পারে। তথায় নবীন ও প্রবীণদের সম্মিলিত অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হয়। নবীন ও প্রবীণের মেল বন্ধনের মাধ্যমে এ সমাজ এগিয়ে যাবে। দুস্থ ও প্রবীণদের সহয়তায় হিতকর ফাণ্ড ‘ডোনেশন ফর মেডিসিন’ চালু আছে। সত্যিকার অর্থে পেরেন্টস লাউঞ্চে এসে প্রবীণগণ একাকীত্ব ও অসহায়ত্ব ভুলে যায়। বার্ধক্যজনিত নিঃসঙ্গতা থেকে সাময়িক ভাবে মুক্তি পান।

প্রবীণ নাগরিক ফোরাম চট্টগ্রাম ২০২২ সাল থেকে চট্টগ্রামে ‘প্রবীণ নাগরিক সম্মাননা’ প্রদান করেছেন যথাক্রমে প্রফেসর ড. অনুপম সেন, প্রফেসর শায়েস্তা খান, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রফেসর বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. গোফরানুল হক, বিআরডিবির ডাইরেক্টর স্বপন গুহ, চা বিশেষজ্ঞ আমিনুর রশীদ কাদেরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. রনজিত কুমার চৌধুরী, শিক্ষা সংগঠক আলহাজ্ব মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান, শিল্প উদ্যোক্তা কনফিডেন্স সল্টের এম ডি সাইদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম কিডনি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার কামালুর রহমান প্রমুখকে।

প্রবীণগণ অবসর সময়ে প্যারেন্টস লাউঞ্চে এসে তাদের সুখদুঃখ একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে, ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে পরম শান্তিতে সময় কাটানোর যোগসূত্র এই ক্লাব। যারা এখানে এসে সময় অতিবাহিত করেন, তাদের মনপ্রাণ প্রশান্তিতে ভরে ওঠে নির্দ্বিধায়। এখানে এলে মন আনন্দ ও প্রশান্তিতে থাকে। মনের খিটখিটে ভাবটি চলে যায়। এক অপার আনন্দ ফগ্লুধারায়ও শান্তিতে ভরে যায় দেহমন। পেরেটন্স লাউঞ্জ ভবিষ্যতে কেয়ারটেকার, ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম আরও উন্নত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। সর্বস্তরের প্রবীণদের প্রতি উদাত্ত আহবান চট্টগ্রামের মতো দেশব্যাপী প্রবীণদের বিশেষায়িত ক্লাবটি গড়ে তুলে প্রবীণদের দু’দণ্ড শান্তির ব্যবস্থা করতে এগিয়ে আসুন। যেখানে নবীন ও প্রবীণদের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বন্ধুত্বের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে নতুন সমাজ। তথা প্রবীণবান্ধব ও কল্যাণময় সমাজ।

লেখক : কবি, ‘প্রবীণ নাগরিক ফোরাম চট্টগ্রামে’র প্রতিষ্ঠাতা, নিসর্গী ও সম্পাদক, প্রকৃতি

পূর্ববর্তী নিবন্ধসায়ফুদ্দিন আহমদ : এক বিরল প্রতিভার প্রয়াণ
পরবর্তী নিবন্ধজুম’আর খুতবা