বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বাণিজ্য-শিক্ষা কার্যক্রম

ওবায়দুল করিম | বৃহস্পতিবার , ১৬ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ

বলা হয়ে থাকে, Business and Commerce are the Lifeblood of all other Social Activities; ব্যবসা ও বাণিজ্য, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম নিয়ন্ত্রক। মানুষ যদি উৎপাদক না হতো, অর্থের বিনিময়ে পণ্যের বিনিময় না করতো, সমাজ, অর্থনীতি কিংবা সংস্কৃতি আধুনিক অর্থে, অস্তিত্ব দেখা যেতনা। আর এমন হলে, আজকের বিনোদন প্রথা, পরিবার, সমাজ, সংঘ অনেক কিছুই থাকতোনা। আমাদের খাবার দাবার, পোশাক পরিচ্ছদ সবই ব্যবসা ও বাণিজ্যের জন্যই।

ব্যবসা ও বাণিজ্যের পরিবর্তন, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও প্রয়োগের উপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তি ও পণ্য, ফলে এর উৎপাদন ও ব্যবসাও বাণিজ্য নির্ভর। বাণিজ্য, বাণিজ্যকে প্রসারিত করে এবং করে অর্থ ব্যবস্থাকে।

প্রযুক্তি প্রয়োগের প্রশ্ন এলে, শিক্ষার ধারণা সামনে আসে। শিক্ষা ছাড়া প্রযুক্তি জানা ও প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। আবার প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও বিনিময়, বাণিজ্য বটে। ফলে বাণিজ্যের প্রসারে রকমফের জানতে হয়। আর এ ও শিক্ষা। মোদ্দা কোথায় প্রযুক্তি ও এর ব্যবহারে পণ্য উৎপাদন হলেই চলবে না, তার বিনিময়ের ও উপযোগিতা সম্পর্কও জানতে হবে। আর তাই শিক্ষা।

বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তি ও বাণিজ্য নির্ভর শিক্ষা একেবারেই শুরুতে দরকার। এই উপলব্ধি থেকেই পোশাক প্রস্তুতকারী শিল্পপতিরা, শিল্পের উন্নয়নে শ্রমশক্তি ও মেধার বিনিয়োগের শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠা করে, চট্টগ্রাম বি জি এম ই এ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি নামের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শুধু প্রযুক্তি নয় এর বিপণনের শিক্ষাকে ও সংযুক্ত করার জন্যে এই প্রতিষ্ঠানেই বাণিজ্য অনুষদ খোলা হয়েছে।

বিপণন ও প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রথমেই মোট খরচের অর্ধেক অর্থেই যে কোন ছাত্র যোগ্যতা সাপেক্ষে ভর্তি হতে পারেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর এমন শিক্ষা বাণিজ্যের সাফল্যের উপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতার প্রয়োজনেই ২০২৬ এর সেপ্টেম্বর সেমিস্টার থেকেই শুরু হচ্ছে ব্যবসায় প্রশাসন শিক্ষা। বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতি অবশ্যই উৎপাদন ও বিনিময় বা বাণিজ্য নির্ভর।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো বস্ত্র ও তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প। এ শিল্প দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০৮৫ শতাংশ অবদান রাখে এবং চার মিলিয়নেরও বেশি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ১০১২ শতাংশ। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আরএমজি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত। তবে শুধু কারিগরি দক্ষতা বা উৎপাদন ক্ষমতা দিয়ে এ শিল্পের টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। আধুনিক বস্ত্র শিল্প এখন শুধু সেলাইকাটার কারখানা নয়; এটি একটি জটিল ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম যেখানে মার্চেন্ডাইজিং, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সাসটেইনেবিলিটি, ব্র্যান্ডিং ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির বাণিজ্য শিক্ষা কার্যক্রম এই চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

বস্ত্র শিল্পের উন্নয়নে বাণিজ্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, বস্ত্র শিল্পের উন্নয়ন আর শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে উন্নীত হওয়া, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও ব্র্যান্ড সৃষ্টির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই রূপান্তরে বাণিজ্য শিক্ষা অপরিহার্য কারণ:

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র। ভিয়েতনাম, ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে টিকে থাকতে হলে শুধু সস্তা শ্রম নয়, দক্ষ মার্চেন্ডাইজিং, সঠিক কস্টিং, ক্রেতা সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও সাপ্লাই চেইন অপটিমাইজেশন প্রয়োজন। বাণিজ্য শিক্ষা এই দক্ষতা গড়ে তোলে। দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) মর্যাদা থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার কথা ছিলো। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের Everything But Arms (EBA) সুবিধা হারাবে। শুল্ক বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কমবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন কৌশলগত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, নতুন বাজার অনুসন্ধান, উচ্চমূল্যের পণ্য (যেমন: ম্যানমেড ফাইবার) উৎপাদন ও ব্র্যান্ডিং। বাণিজ্য শিক্ষা এই কৌশল প্রণয়নে সক্ষম নেতৃত্ব তৈরি করে।

তৃতীয়ত, সাসটেইনেবিলিটি ও কমপ্লায়েন্স এখন ব্যবসার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ক্রেতারা পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রম অধিকার ও স্বচ্ছ সাপ্লাই চেইন দাবি করে। সার্কুলার ইকোনমি, ESG (Environmental, Social, Governance) ম্যানেজমেন্ট ও গ্রিন ফ্যাক্টরি সার্টিফিকেশনের জ্ঞান বাণিজ্য শিক্ষার মাধ্যমেই অর্জন করা যায়। চতুর্থত, ডিজিটাল রূপান্তর ও ইকমাসের্র যুগে ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল মার্কেটিং ও স্মার্ট ফ্যাক্টরি ম্যানেজমেন্ট অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বাণিজ্য শিক্ষা এই আধুনিক দক্ষতা প্রদান করে। পঞ্চমত, উদ্যোক্তা সৃষ্টি। শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, নতুন ফ্যাশন ব্র্যান্ড, টেকসই টেক্সটাইল স্টার্টআপ ও রপ্তানি ব্যবসা গড়ে তোলার জন্য বাণিজ্যিক জ্ঞান ও উদ্যোক্তা মানসিকতা প্রয়োজন।

সুতরাং, বস্ত্র শিল্পের উন্নয়নের জন্য কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি বাণিজ্য শিক্ষা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এটি শিল্পকে নিছক উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বৈশ্বিক মূল্য সৃষ্টিকারী খাতে রূপান্তরিত করবে।

চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি ২০২২ সালে বিজিএমইএএর উদ্যোগে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বস্ত্র ও ফ্যাশন শিল্পের জন্য বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে। এর বাণিজ্য শিক্ষা কার্যক্রম শিল্পের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী ডিজাইন করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। এই প্রোগ্রামগুলো শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, ইন্ডাস্ট্রিলিঙ্কড প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষা প্রদান করে।

চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির বাণিজ্য শিক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ইন্টারফেসিয়াল স্কিলঅর্থাৎ টেকনিক্যাল জ্ঞান (টেক্সটাইল, ফ্যাশন ডিজাইন) ও বাণিজ্যিক দক্ষতার (মার্চেন্ডাইজিং, ম্যানেজমেন্ট, কমপ্লায়েন্স) সমন্বয়। এতে গ্র্যাজুয়েটরা কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া বুঝে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বস্ত্র শিল্প কেন্দ্র। এখানে অসংখ্য রপ্তানিমুখী কারখানা রয়েছে। CBUFT এর অবস্থান এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সহজ করে। বিজিএমইএএর সঙ্গে যুক্ত থাকায় ইন্টার্নশিপ, ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট, গেস্ট লেকচার ও চাকরির সুযোগ সহজলভ্য।

LDC graduation-এর পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় CBUFTএর গ্র্যাজুয়েটরা বিশেষভাবে প্রস্তুত। তারা সাসটেইনেবল বিজনেস মডেল, কমপ্লায়েন্স ম্যানেজমেন্ট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন ও ডিজিটাল টুলস সম্পর্কে জ্ঞান রাখবে। এটি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে এবং উচ্চমূল্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

ঈইটঋঞ তার ভিশন অনুযায়ী Center of Excellence হিসেবে গড়ে উঠছে। এখানকার বাণিজ্য শিক্ষা শুধু চাকরির জন্য নয়, শিল্পের নেতৃত্ব তৈরির জন্য।

বস্ত্র শিল্পের টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বাণিজ্য শিক্ষা এখন আর বিলাসিতা নয়, অপরিহার্য প্রয়োজন। এটি শিল্পকে উৎপাদননির্ভর থেকে মূল্য সৃষ্টি ও উদ্ভাবননির্ভর খাতে রূপান্তরিত করবে। চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি তার অনন্য প্রোগ্রাম, ইন্ডাস্ট্রি সংযোগ ও সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এর গ্র্যাজুয়েটরা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেযেখানে টেকসই উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি একসঙ্গে অর্জিত হবে। জাতীয় অর্থনীতির অগ্রগতিতে চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির বাণিজ্য শিক্ষা একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে কাজ করবে।

লেখক : উপাচার্য, চট্টগ্রাম বি জি এম ই এ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রাম

পূর্ববর্তী নিবন্ধজনগণের বিশ্বাস অর্জিত হয় সততা আর জবাবদিহিতার মাধ্যমে
পরবর্তী নিবন্ধফিশিং বোটসহ ১৯ জেলেকে উদ্ধার করল কোস্ট গার্ড