বিএনপি সরকারের অধীনে কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষণমূলক, স্বজনপ্রীতিনির্ভর কিংবা প্রভাবশালীদের পরিচয়ভিত্তিক ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ব্যবসা–বাণিজ্যে কে কার পরিচিত, কে কতটা প্রভাবশালী, এসব কোনো বিবেচনায় আসবে না। মন্ত্রী, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা অন্য যেকোনো পরিচয়ের আড়ালে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যবসা করার সুযোগ থাকবে না।
গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রামে কাস্টমস ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় বন্দর ও কাস্টমসের দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা, পণ্য খালাসে বিলম্ব, অতিরিক্ত ব্যয়, জটিল রেগুলেশন, আটকে থাকা কন্টেনার এবং অবৈধ ও পরিত্যক্ত পণ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য সময়সীমাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। বন্দর–কাস্টমসের সমন্বয় জোরদারে একটি যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভঙ্গুর অর্থনীতিকে প্রথমে স্থিতিশীল এবং পরে উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি ও শিল্পায়ন বাড়ানো এবং ব্যবসার জন্য নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো অপ্রয়োজনীয় বাধা ছাড়া তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে বিগত সময়ে বিভিন্ন রেগুলেশন ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার মাধ্যমে যে বাধাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে বাজেটে ডিরেগুলেশনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সেই ডিরেগুলেশন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই চট্টগ্রামে বন্দর ও কাস্টমসকে এক টেবিলে বসানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আজকের সভায় আমরা মূলত এনবিআর ও পোর্টের যৌথ উদ্যোগে কাস্টমস ও পোর্টের কার্যক্রম যেন গভীর ও ঝামেলাহীনভাবে চলতে পারে, সে বিষয় নিয়ে বসেছি। তিনি বলেন, কাস্টমসের রেগুলেশন জটিলতা এবং বন্দরে অতিরিক্ত খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকেই। কারণ আমদানি করা পণ্যের খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়ে বাজারদরে, একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে যায়।
মন্ত্রী বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বন্দর চেয়ারম্যানকে নিয়ে যৌথভাবে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিটি সমস্যার সমাধান কী হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সিদ্ধান্তগুলো লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কোন সিদ্ধান্ত কত দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে, তারও নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বন্দর ও কাস্টমসের মধ্যে দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, দুটি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। এবার প্রথমবারের মতো কার্যকরভাবে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত সাহসের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে আমদানি পণ্য খালাস ও রপ্তানি কার্যক্রমের সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে বাড়বে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা।
চট্টগ্রাম কাস্টমস চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কন্টেনার ও বিভিন্ন ধরনের আটকে থাকা পণ্য নিয়েও সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু অবৈধ ও আটকে থাকা পণ্য কাস্টমস চত্বরে জমে জট তৈরি করেছে। বৈরী অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে একাধিক কন্টেনার আটকে থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। কাস্টমস চত্বরকে এসব জট থেকে পুরোপুরি মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে।
এক্ষেত্রে ব্যক্তি পরিচয় বা রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে কোনো সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। তার ভাষায়, খালাস বা ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যক্তির পরিচয় কিংবা প্রভাব কোনো কাজে আসবে না। কারো জন্য আলাদা সুযোগ–সুবিধা বা পৃষ্ঠপোষণমূলক ব্যবস্থার স্থান থাকবে না।
অপরদিকে চট্টগ্রামকে ঘিরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফিলিপাইন থেকে সরাসরি চট্টগ্রামে এসে স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন। এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম নিয়ে এডিবির বড় ধরনের পরিকল্পনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
আমির খসরু বলেন, এডিবি চট্টগ্রামকে শুধু একটি লজিস্টিকস হাব হিসেবে দেখতে চায় না, আগামী দিনে পুরো বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রপথিক হিসেবে দেখতে চায়। বন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলার পাশাপাশি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আঞ্চলিক উন্নয়ন কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হবে। চট্টগ্রামের আগামী দিনের উন্নয়নের জন্য এটিকে তিনি বিশাল সুখবর হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মো. নাজমুল হোসাইনসহ বন্দর ও কাস্টমসের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।











