২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা, ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বে তেলের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। হরমুজ প্রণালি ইরানের দখলে চলে যাওয়ায় জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, শুরু হয় তেলের সংকট। বিশ্বের প্রতিটি দেশ তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশেও এর প্রভাবে তেলের দাম বাড়াতে হয়। যদিও বাড়ানো দামেও সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতিতে একধরনের চাপ ও মন্দা সৃষ্টি হয়েছে। এই চাপ থেকে রক্ষার লক্ষ্যে তেলের চাহিদা কমানোর জন্য সরকার রিনিউএবল এনার্জির দিকে ঝুঁকছে। সেজন্য সোলার ইকুইপমেন্ট আমদানির ক্ষেত্রে প্যানেল থেকে শুরু করে ইনভার্টার, তার, ব্যাটারি, মাউন্টিং স্ট্রাকচারসহ সবকিছু ১% ডিউটি পরিশোধ সাপেক্ষে ছাড়ের ব্যবস্থা করেছে। শুধু তাই নয়, এই সুবিধা বাণিজ্যিক ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল আমদানিকারক সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে যে কেউ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবে। ব্যাংক লোনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে অন্তত ৫,০০০ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ব্যবস্থা করা। অন্যদিকে, সূর্যের আলোর সাহায্যে উৎপাদিত বিদ্যুৎ যদি দিনের বেলায় ৮/৯ ঘণ্টা সরবরাহ করা যায়, তবে তেলের আমদানি বাবদ হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। এতে তেল/গ্যাস আমদানির নির্ভরতা অনেকাংশে কমবে এবং সাশ্রয় হবে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপকরণ ‘সিলিকনভিত্তিক পাতলা ফিল্মের সৌরকোষ’ বর্তমানে সোলার প্যানেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যদিও এটি সূর্যের মাত্র ১৫% আলো বিদ্যুতে রূপান্তর করতে পারে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে, কীভাবে সৌরকোষের সক্ষমতা আরও বাড়ানো যায়। আমাদের দেশেও চলছে এ বিষয়ে গবেষণা। আশার কথা হলো, সৌরপ্যানেলের কার্যকারিতা বর্তমানের চেয়ে কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব বলে দাবি করছেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) একদল শিক্ষার্থী। তাঁরা তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংভিত্তিক সিমুলেশনের মাধ্যমে করা গবেষণায় এই ফল পাওয়া গেছে। গবেষক দলটির সদস্যরা সবাই আইইউবির তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। গবেষণাটি তত্ত্বাবধান করেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের প্রধান ও ফোটোনিকস সিমুলেশন ল্যাবরেটরির (আইইউবিপিএসএল) পরিচালক জনাব মুস্তাফা হাবিব চৌধুরী।
এই গবেষণায় উঠে এসেছে, সিলিকনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট কাঠামোয় সাজানো হলে এবং অক্সিডেশন প্রতিরোধ করা গেলে রুপা, অ্যালুমিনিয়াম ও টাইটেনিয়ামের মতো ধাতব অতি ক্ষুদ্র কণা (ন্যানোপার্টিকল) আরও ভালোভাবে সূর্যের আলো ধরে রাখতে পারে। এই শিক্ষার্থীদের দুটি গবেষণা তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস এবং কম্পিউটার প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (আইইইই) ডিজিটাল লাইব্রেরি ‘আইইইই এক্সপ্লোর’ এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা ডেটাবেজ স্কোপাসে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সৌরকোষের আলো শোষণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো দলের লক্ষ্য জানিয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম আছে। এগুলোর দক্ষতা মাত্র ১৫%; যদি আমরা এটিকে ৪৫–৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারি, তাহলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’
জানা যায়, ধাতব কণার মুক্ত ইলেকট্রনগুলো আলো বা অন্যান্য তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি করে। কিন্তু বাতাসের সংস্পর্শে এলে ধাতব কণাগুলো ‘অক্সিডাইজড’ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, সাধারণ সিলিকনের অতি ক্ষুদ্র কণায় মুক্ত ইলেকট্রন থাকে না। গবেষণার এ বিষয়টি নিয়ে তাঁরা বলেন, ‘বাতাসের সংস্পর্শ থেকে সুরক্ষিত রাখতে ধাতব অতি ক্ষুদ্র কণার ওপর কাচের একটি পাতলা আবরণ দিতে হয়। আমরা প্লাজমনিক মেটাল কোর–ডাইইলেকট্রিক শেল প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি উন্নতমানের থিন–ফিল্ম সৌরকোষ নকশা করেছি। এটি প্রচলিত সিলিকন ফিল্মের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।’
নির্দিষ্ট আকৃতির ধাতব অতি ক্ষুদ্র কণাগুলোকে ক্লাস্টার বা গুচ্ছ হিসেবে সাজিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখিয়েছেন তাঁরা। দলটি বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংভিত্তিক একটি অ্যালগরিদম তৈরিতে কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের অগ্রগতিতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে সুপারভাইজারের অভিমত, ‘আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতেই হবে। কম কার্যক্ষমতার সৌরপ্যানেল থেকে দেশের বিশাল সুবিধা পাওয়া কঠিন। তাই এর কার্যক্ষমতা বাড়ানোই গবেষণার মূল লক্ষ্য। এই উচ্চস্তরের গবেষণা আমাদের তৃতীয় বর্ষের তরুণেরা করছে। এ জন্য অনেক বিষয়ের থিওরি এবং সফটওয়্যার নিজেদেরই শিখতে হয়েছে। এটা একটি চ্যালেঞ্জ ছিল।’
এ প্রসঙ্গে আইইউবির উপাচার্যের অভিমত, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সহজলভ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি হলো সৌরশক্তি। এর কার্যকারিতা বাড়ানো গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারব।’
এবার আসা যাক একজন অধ্যাপকের সাফল্য ও স্বীকৃতি নিয়ে। রাজশাহী কলেজের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. সাজেদুল ইসলাম। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়। বইটি হলো Hydrochemical Evaluation and Grounderwater Quality। প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধ ও প্রাচীন প্রকাশনা সংস্থা স্প্রিঙ্গার।
বইটি লিখতে তাঁর ছয় থেকে সাত মাস সময় লেগেছে। কিন্তু রিভিউ ও অন্যান্য কাজে লেগেছে আরও প্রায় এক বছর। বইয়ে ভূ–রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে জলস্তরের ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তনের কৌশল ও মাত্রা বিষয়ে গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ স্থান পেয়েছে। জলস্তরে খনিজ–পানির সম্ভাব্য মিথস্ক্রিয়ার কৌশল, পানিতে বিষাক্ত ভারী ধাতুর সংমিশ্রণ, তাপগতীয় ব্যাখ্যা, জলস্তরে দ্রবীভূত কার্বন ডাই–অক্সাইড গ্যাসের প্রভাব, পানিদূষণের উৎস, প্রাকৃতিক নিয়ামকের প্রভাবের ধরন, আইসোটোপ লঘূকরণসহ নানা বিষয় উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক সাজেদুল ইসলাম। বিশ্বের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে ভূ–রসায়ন, ভূতাত্ত্বিক জলস্তর ও ভূগর্ভস্থ পানির গুণাগুণ ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে যেসব গবেষক গবেষণা করেন, তাঁদের জন্য বইটি সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বইয়ের একটি অধ্যায় নিয়ে লেখকের অভিমত, ‘যেকোনো প্রাণী পানি পান করে। পানি ছাড়া আরও প্রায় ৩০ রকম খনিজ উপাদান গ্রহণ করার জন্য আমরা পানি পান করি। এগুলো অন্য কোনো খাবার থেকে সহজে পাওয়া যায় না। তবে এসব উপাদানের নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। মাত্রা বেশি হলে সেটি শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর।’
অধ্যাপক সাজেদুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পরে পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এই ইনস্টিটিউটের পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন পরিবেশ তথা ভূগর্ভস্থ পানি ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি জানান, তাঁর রচিত অন্তত ৩৫টি গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনি বেশ কয়েকটি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপন করেছেন।
আসলে আমাদের দেশে মেধার কোনো কমতি নেই। সারা দেশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে অসংখ্য মেধা। তবে অভাব হচ্ছে তার সঠিক পরিচর্যা, প্রয়োগ, স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতার। তাই এসব গবেষণাকে যদি সঠিক মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দিতে পারি, তবে শিগগিরই আমরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রেভল্যুশন করতে পারব এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।












