বাংলা কবিতায় পালাবদল এবং একজন শামসুর রাহমান

রতন কুমার তুরী | শুক্রবার , ২১ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ

একজন কবি কতটুকু জ্ঞানী এবং ধীমান হলে পঞ্চাশ দশকের আগে চলে আসা কবিতার ধারাকে বাঁক বদল করে একটি অনন্য ধারায় সমৃদ্ধ করতে পারে তা শামসুর রাহমানের কবিতা না পড়লে বোঝা প্রায় অসম্ভব। তেমনি এক নতুন ধারার কবি শামসুর রাহমান। বাংলা কবিতার জগতে কবি শামসুর রাহমান এক উজ্জ্বলতম নাম। কবিতার বিষয় বৈচিত্র্যকে মনের মাধুরি মিশিয়ে পাঠকের কাছে হৃদয়গ্রাহ্য করাই শামসুর রাহমানের কাব্যের অন্যতম গুণ।

বাংলা কবিতার পালাবদলে তার স্বতন্ত্র উজ্জ্বল কণ্ঠস্বর অনায়াসে চিহ্নিত করা যায়। তার নামের সঙ্গে ‘প্রধান কবি’ অভিধা সংযুক্ত হওয়ার অনিবার্যতা তার সৃষ্টি কুশলতায়। শামসুর রাহমান পঞ্চাশ দশকে বাংলা কবিতায় আবির্ভূত হয়ে কবিতার বিষয়বৈচিত্র্য, বর্ণনারীতি ও রূপব্যঞ্জনা নির্মাণে আধুনিক রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। তিরিশের পাঁচ কবির আধুনিক কাব্যভূমি নির্মাণ ও নিরীক্ষার যাত্রা চল্লিশের ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন ও আহসান হাবীবের ভিন্নতর সীমা চিহ্নিত করায় পাঠক পাশ্চাত্যের কবিতার নতুন সুর অনুরণিত হতে দেখে। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজজীবনে যে পরিবর্তন ঘটে তা এ অঞ্চলের কবিচিত্তে আলোড়ন তোলে। ঐতিহ্য চেতনা, মুসলিম মানসের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কয়েকজন কবি কবিতাচর্চায় মনোযোগী হন। এক্ষেত্রে পঞ্চাশে ব্যতিক্রম শামসুর রাহমান ও হাসান হাফিজুর রহমান। স্বদেশ, সমকাল ও স্বাজাত্যবোধ এদের কবিতার আরাধ্য। ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের উদ্ভব কবি চেতনায় যে আলোড়ন তোলে তা পরবর্তীকালে ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্য চর্চায় নতুন গতিবেগ সঞ্চার করে। বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিবেশ, বাঙালির অধিকার বঞ্চনা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ কবিরা ১৯৫০এ আশরাফ সিদ্দিকী ও আবদুর রশীদ খান সম্পাদিত ‘নতুন কবিতা’ গ্রন্থে তেরোজন কবি নতুন একটি পথ আবিষ্কারে প্রয়াসী ছিলেন। অনেকেই কালের স্রোতে হারিয়ে যান। কাব্যপ্রতিভার ব্যতিক্রমদীপ্তি ও মেধার স্ফুরণ ঘটে কবি শামসুর রাহমানের কবিতায়। শামসুর রাহমান দিন দিন কবিতা সৃষ্টিতে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছেন। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনে একদল কবি স্বদেশ প্রেরণাজাত কবিতায় পাঠককে আকৃষ্ট করেন। কবিতা ভুবনের ভূগোল বদলে দেন গ্রন্থবদ্ধ কবিরা। শামসুর রাহমান এদের মধ্যে অগ্রসর ছিলেন। তার পর্যবেক্ষণ অন্য কবিদের কবিতা রচনায় উদ্বুদ্ধ করে কবিতার ভাষা নির্মাণ, উপমা প্রয়োগ ও বর্ণনা রীতির পরিবর্তনে। শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০এ। তার কবিতায় আধুনিক জীবনের কল্লোল ও নতুন চিন্তাচেতনার অনুপ্রবেশ ঘটে। শামসুর রাহমান সমাজমনস্ক, প্রকৃতিপ্রেমিক ও আত্মজৈবনিক বিষয় কবিতায় ধারণ করেন। শামসুর রাহমান প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’তে সৌন্দর্যপ্রিয়তা, স্মৃতি ও অন্ধকার থেকে আলোতে প্রত্যাবর্তনের তৃষ্ণাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। বিষণ্নতা, নিঃসঙ্গ চেতনা, প্রেম ও নতুন পৃথিবীতে প্রবেশের প্রবল স্পৃহা গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোয় নতুন জগৎ উন্মোচিত করেছে। আত্মমগ্ন সৌন্দর্য পিয়াসী কবি নিজের চারপাশের সবকিছু একবার পরখ করেন। অবিরত উল্লাস ও আনন্দ ধ্বনি উচ্চারণে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন। মনোজগৎ ও স্বপ্নময় পৃথিবীতে বিচরণ করে শামসুর রাহমান রচনা করেছেন, ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘জর্নাল, শ্রাবণ’, ‘এ্যাপোলোর জন্যে’, ‘রূপালি স্নান’, ‘কবর খোঁড়ার গান’, ‘একান্ত গোলাপ’, ‘সেই ঘোড়াটা’, ‘তিন শো টাকার আমি’। পৃথিবী, সৌন্দর্য, স্বপ্ন ও চারপাশের ঘটনা প্রবাহে শামসুর রাহমান পাঠককে পরিচিত করে তোলেন। তার কণ্ঠ আর্দ্র:

উল্লোল নগরে কত বিলোল উৎসবে; কিন্তু তবু

পারি না মেলাতে আপনাকে প্রমোদের মোহময়,

বিচিত্র বিকট স্বর্গে। বিষাক্ত ফুলের মতো কত

তন্ময় রহস্য জ্বলে ওঠে আজো দুচোখে আমার।”

(প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

শামসুর রাহমান আত্মমগ্নতা থেকে বেরিয়ে এসে স্বদেশ, মানুষ, রাজনীতির ঘূর্ণি, ব্যক্তিগত সুখদুঃখে লীন হয়েছেন: রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩), বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৭), নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮), নিজ বাসভূমে (১৯৭০), বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২), দুঃসময়ে মুখোমুখি (১৯৭৩), ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা (১৯৭৪), আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি (১৯৭৪), একধরনের অহংকার (১৯৭৫), আমি অনাহারী (১৯৭৬), বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে (১৯৭৭), প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে (১৯৭৮), মাতাল ঋত্বিক (১৯৮২), ইকারুসের আকাশ (১৯৮২), কবিতার সঙ্গে গেরস্থালি (১৯৮৩), উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ (১৯৮৩), নায়কের ছায়া (১৯৮৩), একফোঁটা কেমন অনল (১৯৮৬) কাব্যগ্রন্থের বিপুল ঐশ্বর্যমণ্ডিত কবিতায়। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয় জীবনের স্মরণীয় মুহূর্তে শামসুর রাহমান কবিতার ভূমিকে শস্যশ্যামল ও গতিময় করে তুলেছেন। ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘আসাদের শার্ট’, স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনতা ঘিরে তার আবেগ প্রকাশ, বর্ণনা উত্তরোত্তর আমাদের চেতনাকে শানিত করেছে। একীভূত পাঠ যে কবিকে চেনে সে প্রথম কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গপত্র থেকে পৃথক ও দৃঢ়চেতা। শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’এর উৎসর্গ অংশে উল্লেখ করেছিলেন:

আমার খামার নেই নেই কোনো শস্যকণা

আছে ধুধু একটি আকাশ।

তারই কিছু আলোনীল আজো হে সুদূরতমা

ভালোবেসে তোমাকে দিলাম।।”

শামসুর রাহমান জীবনানন্দের পৃথিবীকে প্রত্যক্ষ করেন। তার কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষ একাকার। ‘ধূসর সন্ধ্যা’, ‘ইঁদুরের মতো মৃত্যু’-‘এ্যাপোলোর জন্যে’ কবিতায় যে রূপক ব্যঞ্জনা তৈরি করেন তা বিস্ময়সূচক। শিশিরের জলে কবি অজস্র তারাকে দেখতে পান ‘জর্নাল, শ্রাবণ’এ। শামসুর রাহমান কবিতার পথ ধরে দীর্ঘসময় পরিভ্রমণ করেছেন। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্র করোটিতে’ (১৯৬৩) সৌন্দর্য রহিত এক পৃথিবী উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে চোখের সামনে। ঢাকা নগরের রুগ্নতার প্রতিভাস তার কবিতায় লক্ষ করা যায়। ভিখেরি, মাতাল, কোলাহল, বস্তির ব্যথিত প্রতিবেশ ও মানুষের আহাজারি কবিতার ভাষাকে বিষণ্ন করে। ‘সর্বনাম’এর বিপুল ব্যবহার বারবার উঠে আসে। দুঃখ ভারাক্রান্ত এক কবি উচ্চারণ করেন:

আমাদের বারান্দায় ঘরে চৌকাঠে

কড়িকাঠে চেয়ারে টেবিলে আর ঘাটে

দুঃখ তার লেখে নাম। ছাদের কার্নিশ, খড়খড়ি

ফ্রেমের বার্নিশ আর মেঝের ধুলোয়

দুঃখ তার আঁকে চকখড়ি

এবং বুলোয়

তুলি বাঁশিবাজা আমাদের এই নাটে।

(‘দুঃখ’রৌদ্র করোটিতে)

দুঃখ’ শামসুর রাহমানের চোখে সর্বব্যাপী। একজন দুঃখী মানুষ চারপাশের সব স্থানে তার বেদনাকে প্লাবিত রাখে। যাপিত জীবনে সে বারবার সুন্দরকে স্পর্শ করার আকাঙ্‌ক্ষায় যেমন ব্যাকুল থাকে, আনন্দকে ভাগ করে নেয়ার শক্তি তার মধ্যে ক্রিয়াশীল সেভাবেই। বেদনা ও দুঃখ সমার্থক অর্থ বহন করে তার জীবনে। দুঃখের মধ্যেও একধরনের ব্যাপকতা, স্পর্শ চেতনা শামসুর রাহমান জাগরিত রাখেন।

শামসুর রাহমান আত্মপ্রত্যয়ী। তার সৌন্দর্যপিয়াসু কবিসত্তা স্বদেশ ও সমকালের চিত্রসমূহ একত্রিত করে যে ক্রমবহমান সেলুলয়েডের ফিতার আটকে দেয়, সমাজ জীবনে তা আমাদের প্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত। ‘রৌদ্র করোটি’তে বস্তুবাদী বিশ্বের যে পরিচিত ব্যাপ্ত হয় তা তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’তে প্রসারমান হয়ে ঢাকার নগর জীবনে ঢুকে পড়ে।

শামসুর রাহমান কঙ্কাল সাথে নিয়ে হাঁটেন। নিজেকে আবিষ্কার, শৈশবকৈশোরের স্মৃতিবাহী ঘটনার সঙ্গে বর্তমানের মেলবন্ধন তৈরি করে কবি সময়কে চিত্রিত করে। সমকাল প্রবাহিত জীবন অতীতভবিষ্যতের দিকে হাত তুলে ধরে। কবির নিবিড় সমাজলগ্নতা অন্তরঙ্গময়।

শামসুর রাহমান ‘হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো’ ও ‘শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থে রূপময় স্বদেশ, শস্যশ্যামল ভূমি ও কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের উদ্দেশ্যে তার অভিসারের দিকনির্দেশ করেছেন। তিমির বিনাশী কবি বারবার ফিরে আসতে চেয়েছেন জীবনানন্দের বাংলায়। শামসুর রাহমান চোখের সামনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন। আশা প্রবলভাবে তাড়িত। মাঝে মধ্যে নিরাশাদুর্ভাবনা তাকে আলোড়িত করেছে। তিনি দুঃসময় ও অন্ধকার থেকে আলোর মোহনায় পৌঁছে গেছেন। শামসুর রাহমানের কবিতায় স্বদেশ উর্বরা, শত্রুমুক্ত ও নিরাপদ। তিনি কবি হিসেবে বিশ্বাস করেন স্বপ্ন জ্বালিয়ে রাখতে হয়। ভবিষ্যৎ আশাও আলোময় হয়ে উঠবে এ বিশ্বাস থেকে কবির কবিতা হয়ে ওঠে মানুষের পথচলার আলোকবর্তিকা। কবি তো দ্রষ্টা। সমকাল ও স্বাজাত্যবোধ এদের কবিতার আরাধ্য। শামসুর রহমান শুধু একজন কবিই নন, তিনি বাংলা কবিতাকে দিয়েছেন রূপ, লাবণ্য এবং মানবিক কল্যাণময়ী ধারা। তাঁর কবিতা বাংলা সাহিত্যে যুগে যুগে অমর এবং অক্ষয়। সমাজ সভ্যতাকে কবিতায় গেঁথে কীভাবে পথচলা যায় তা শামসুর রাহমান শিখিয়েছেন আমাদের। কবি শামসুর রাহমানের কবিতা পথ চলুক অনন্তকাল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাসুলের (সা.) শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা ব্যতীত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়
পরবর্তী নিবন্ধবিরল কাব্যপ্রতিভা