বহুমুখী সংকটে জেলেরা

তেল সংকট, জলদস্যুর উৎপাত, আসছে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা কক্সবাজারে ৭০ ভাগ ফিশিং ট্রলার বন্ধ

ফরিদুল আলম দেওয়ান, মহেশখালী | শনিবার , ১১ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ

তেল সংকট, সাগরে মাছের স্বল্পতা ও জলদস্যুদের উপদ্রবের কারণে কক্সবাজারে অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। তার উপর সাগরে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে ৫৮ দিনের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার জেলে ও তাদের পরিবার।

কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি হিসাবে জেলায় প্রায় ৫ হাজার ২৫০টি মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ ট্রলার সাগরে যেতে পারছে। ৭০ শতাংশ ট্রলার বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, সংকট সৃষ্টির আগে যেসব ট্রলার তেল সংগ্রহ করতে পেরেছিল, সেগুলোর কিছু এখনো চলমান থাকলেও নতুন করে তেল না পাওয়ায় অধিকাংশ ট্রলার অচল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে পুরো জেলায় ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০টি ট্রলার সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ট্রলার পরিচালনায় সবচেয়ে বড় সংকট এখন জ্বালানি তেল। তেল সংকটে থমকে যাচ্ছে মাছ ধরা। ম্যাক্সিমাম ট্রলারের কাছেই তেল নেই। যারা পাচ্ছেন তারাও পর্যাপ্ত পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে এক সপ্তাহ বা ১০ দিনে অল্প পরিমাণ তেল মিলছে। তিনি জানান, সমুদ্রে ভাসমান তেল সরবরাহ ব্যবস্থাও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, তেলের পাশাপাশি সাগরে মাছের অপ্রতুলতা এবং ডাকাতের উপদ্রবও ট্রলার চলাচল কমে যাওয়ার বড় কারণ। ঝুঁকি ও খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক মালিক ট্রলার সাগরে পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

তিনি বলেন, কক্সবাজারে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার ৮১৮ জন। তবে নিবন্ধনের বাইরে আরো অনেক জেলে রয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত ১০ থেকে ২০ হাজার জেলে সাগরে যেতে পারছেন না। ফলে তারা কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। হাজার হাজার জেলে এখন কর্মহীন।

ফিশিং বোট মালিকরা জানান, আসছে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে, যা মাছের প্রজনন মৌসুমকে কেন্দ্র করে দেওয়া হয়। যেসব ট্রলার এখন সাগরে আছে, সেগুলো ফিরে এলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে আবার যেতে পারবে না।

নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৫ সালের পর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা ছোট জেলেদের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। তার মতে, সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে দেশের মাছের সরবরাহ কমে যাবে, যার প্রভাব পড়বে বাজারে। এ কারণে তিনি সরকারের কাছে এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গার জেলে আকতার হোসেন বলেন, আমরা সমুদ্রে যেতে না পারল কর্মহীন হয়ে পড়ি এবং ঘরে খাবার থাকে না। আগে সপ্তাহে দুইতিনবার সাগরে যেতাম। এখন তেল নেই, ট্রলার বন্ধ। ঘরে বসে থাকি। কাজ নেই, আয় নেই।

মহেশখালীর হোয়ানক কালাগাজী পাড়ার জেলে জমি উদ্দিন বলেন, সমুদ্রে গেলেও ভয় আছে। জলদস্যুদের উপদ্রব বাড়ছে। আর মাছও আগের মতো পাওয়া যায় না। খরচ উঠে না, তাই অনেকে যাচ্ছে না। আমরা দিনে এনে দিনে খেয়ে চলি। ১০১৫ দিন সাগরে যেতে না পারলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। এখন অনেকেই ধারদেনা করে চলছে। আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে আবার নিষেধাজ্ঞা আসছে। এই অবস্থায় যদি সাগরে যেতে না পারি, তাহলে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।

আরেক জেলে রশিদ আহমদ বলেন, সরকার যদি তেলের ব্যবস্থা না করে বা কোনো সহায়তা না দেয়, তাহলে আমাদের অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকাপ্তাইয়ে দেশের একমাত্র কার্গো ট্রলি বন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে আরও আট শিশুর হাম শনাক্ত, উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ১৫ জন