১৯৮১ সালের জুলাই মাসের ২৬ তারিখে এক দুর্ঘটনায় আমার স্বামী ডা.বদিউজ্জামান চৌধুরীর মৃত্যু হয়। মানুষ তো অবিনশ্বর নয় মৃত্যু অনিবার্য। তারপরও এই অকাল মৃত্যু অসহনীয় কষ্ট দিচ্ছিল আমাকে। তার তো কোন অসুখ করেনি, কারো সাথে আমাদের ঝগড়াবিবাদ ছিল না। তারপরও মানুষের হিংসার জন্য সুস্থ সবল মানুষটা একজন রক্তলোলুপ হায়েনার শিকার হয়েছিলো । তখন আমার বাচ্চাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ১৩,৮ ও ২ বৎসর।
এমন একটা সময়ে সে চিরদিনের মতো আমাকে ছেড়ে চলে গেলো যখন সুখ স্বপ্নের কল্পনাকে খুব কাছাকাছি মনে হয়েছিলো। তখনই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ভেঙ্গে দিয়ে গেল আমার সুখের সংসার। আমার স্বামীর মৃত্যুর পর তিন মাস আমার কোনো চেতনা ছিল না। আমি নিজে কিছু করতাম না আমাকে সবকিছু করে দিতে হতো। আর আমার শ্বশুরকে দেখলে বলতাম বাবা আপনি সবসময় বলতেন, আমার জন্য দোয়া করেন তবুও কেন এমন হলো ।
ঘটনার পরপরই আমি কথা–বার্তা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। একদিন আমার ছোট ছেলে মোহিত খুব কাঁদছিলো, তখন আমার মা আর সহ্য করতে না পেরে মোহিতকে আমার কোলে দিয়ে বললেন তুইতো পাথর হয়ে গিয়েছিস। এগুলোকেও পাথর বানিয়ে দে, আমি আর তোর কষ্ট দেখতে পারছি না। তখনই আমার চেতনা এসেছিলো, তাড়াতাড়ি করে আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে আমার নিজের বাসায় চলে আসলাম।’ এই তিনমাস আমার স্বামীর মৃত্যুর পর আমার বাবা, মার কাছে ছিলাম। আমি আমার ছেলেদের মাঝে খুঁজে পেলাম বাঁচার তাগিদ।
একা আমি। তখন আমার বয়স ৩২ বৎসর। নিকট আত্মীয়রা নানা ভাবনায় জর্জরিত করছিলো আমাকে। পাড়া প্রতিবেশী সকলেই চিন্তা করছিলো একা একটি মেয়ের পক্ষে তিনটি ছেলে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই যে কোন একটা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সবাই উৎসাহী। কিন্তু আমি আমার স্বামীর বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে স্বামীর স্বপ্ন সফল করার তাগিদে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ধীরে ধীরে তিনটি ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছি। সেই সাথে আমার দেওরদের ছেলেমেয়েদের মানুষ করার চেষ্টা করেছি। নিজে তাদের পড়িয়েছি। নোট করে দিয়েছি যাতে পরীক্ষায় ভালো করতে পারে। খেলার মাঠে দেরী করলে বা কোন ভুল করলে, রাজনীতির পোকার আলামত পেলেই বকেছি, মেরেছি আমার বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকেই বুঝিয়ে ছিলাম ওরা কি করলে আমি খুশী হই, কিসে রাগ হই। বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকেই বলতাম কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, নৈতিক চরিত্র, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শিখতে হবে। তাহলে আর খারাপ হবার ভয় থাকে না। আমাকে আমার ছেলেদের জন্য বাবা এবং মা দুটোই হতে হয়েছে। শাসন ও আদর দুটোই দিতে হয়েছে। ওরাও বুঝতো আমার কষ্ট ।
আমার মতে বাচ্চাদের আদরের সাথে সাথে শাসন করাটাও প্রয়োজন। ছোটবেলাতেই ওদের বুঝাতে হবে সময় অথবা অর্থ কোনটাই অপচয় করা যাবে না। আপনার হয়তো অনেক টাকা আছে, কিন্তু চাওয়া মাত্রই সবকিছু দিবেন না। সামর্থ্য থাকলেও কিছুদিন পরে দিবেন। তাদের বুঝিয়ে দিবেন অভাবটা কি। বাবা মা কি করলে খুশি হয় আর কি করলে রাগ হয়, ওরা যদি অল্প বয়সে বুঝে যায়, তাহলে বড় হলে ভুল করবে না।
আজ আমার বড় ছেলে নাহিদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেরিন সায়েন্সে মাস্টার্স করার পর বৃত্তি নিয়ে থাইল্যান্ড এ.আই.টি থেকে এমএস করেছে এরপর ফুল ব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে কানাডায় গুয়েল্ফ ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছে। একটি কানাডা ভিত্তিক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে এশিয়ার ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিল। বর্তমানে গাজিপুর Meverick Innovation নামে একটি স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান শুরু করেছে, যা দেশের মাছ ও পোল্ট্রি শিল্প বিকাশে অবদান রাখছে । মেজ ছেলে তৌহিদ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে, বিসিএস (স্বাস্থ্য) বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়্যান এন্ড সায়েন্স (ঢাকা) মেডিসিনে এফসিপিএস করে । এছাড়াও এফআরসিপি (Glasgow), এফএসিপি (USA) । বর্তমানে নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজে এসোসিয়্যাট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছে।
ছোট ছেলে মোহিত ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে। এফ.সি.পি.এস প্রথম পর্ব, বিসিএস (স্বাস্থ্য) শেষে বাংলাদেশ সরকারি ফটিকছড়িতে পোস্টিং ছিল। পরে স্কলারশিপ নিয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে এমপিএইচ করে। তারপর সরকারি চাকুরি ছেড়ে দিয়ে IC.D.D.R.B তে চাকরি আরম্ভ করে। অত:পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ কেরোলিনা থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছে। আমার ছেলে আমাকে কথা দিয়েছিলো সে বাংলাদেশে ফিরে আসবে। কিন্তু আমার বন্ধুবান্ধব আমাকে বলেছিলো তোমার ছেলে আমেরিকার মোহ ছেড়ে ফিরে আসতে পারবে না। আমি কিন্তু বলেছি আমার মোহিত চলে আসবে। মোহিত চলে এসেছে বাংলাদেশে আমার কাছে। ও বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইম্যান এর Associate Dean of Natural Science এবং Associate Professor হিসেবে আছে ।
সেই অল্প বয়সে তিনজন অবুঝ সন্তানকে কঠোর পরিশ্রম ও সাধনার মধ্যে দিয়ে বড় করে তুলতে পারবো ভাবিনি। জীবনের প্রতিকূল ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তিন ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করতে পেরেছি। ওরা শুধু লেখাপড়া করেনি বাবার মতো ভালো মানুষ হয়েছে। ওদের বাবার স্বপ্ন সার্থক করতে পেরেছি। আল্লাহর কাছ শুকরিয়া আদায় করি।
প্রত্যেক মানুষ ইচ্ছা করলে অসাধ্য সাধন করতে পারে। আল্লাহ প্রত্যেক মানুষকে নিজের ইচ্ছামত বিকশিত ও পল্লবিত হওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন। আমার প্রয়াত সভানেত্রী রওশন আপার হাত ধরে মহিলা সমিতিতে আসা। কিন্তু এখন আমি মহিলা সমিতির সাথে মনেপ্রাণে জড়িয়ে আছি অনেকদিন ধরে। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি ২২ বৎসর। আমাদের হলটা বাওয়া স্কুল খালি করে দেওয়ার পর সভানেত্রী রওশন আপা বললো, রোকেয়া কি করা যায় বলো? তখন আমি বললাম সমাজসেবা করার জন্য অর্থের প্রয়োজন। মানুষের কাছে হাত পেতে পেতে সমাজসেবা হয় না। তখন আমরা কমিটির মেম্বার নিয়ে পরামর্শ করলাম স্কুল করার জন্য। আমাদের তখন টাকা ছিলো না। ১৯৯৫ সালে কমিটির মেম্বারদের কয়েকজন মিলে ৭০,০০০ টাকা তুলে আমার হাতে দেন। সেই টাকা দিয়ে ১৯৯৬ সালে স্কুল প্রেপ–ওয়ান এবং প্রেপ–টু এই দুইটা ক্লাস নিয়ে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি কিন্ডার গার্টেন এর পদচারণা শুরু হয়। আমার আপ্রাণ চেষ্টা ছিলো বাচ্চাদের ভিত্তিটা ঠিক মতো তৈরি করে দেওয়া। ভিত্তি ভালো হলে ছাত্রছাত্রীরা কোথাও আটকায় না। তাই যাতে সুস্থ, সুন্দর মানসিকতায় লেখাপড়া করতে পারে, সবাই আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। গরিব বাচ্চাদের বিনা বেতনে শিক্ষা প্রদান করার চেষ্টা চালিয়ে আসছি। এই প্রতিষ্ঠানকে এই পর্যায়ে এনে দাঁড় করাতে আমাকে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছে। প্রয়াত প্রাক্তন সভাপতি রওশন জাহান রহমান ও আমাদের প্রধান শিক্ষয়িত্রী বেগম হাসনা হেনা অসম্ভব সহায়তা করেছেন। কোন লাভ বা নাম, সুনামের আশায় নয়, শুধুমাত্র সমাজের হিতার্থে মঙ্গল কামনায় এই প্রচেষ্টা। এই স্কুলের শিক্ষাপ্রদান পদ্ধতি উন্নত মানের যেটা অভিভাবকদের প্রশংসাও অর্জন করেছে। আমি বরাবরের মতো স্কুল নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছি আর এখনও নিরলস ও নিঃস্বার্থভাবে কাটিয়ে যাচ্ছি নিজের সন্তানের মতো করে। আমার জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন, পাশে থেকেছেন তাদের সবাইকে আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।














