প্রবীণদের বিষয়ে বেশি যত্নবান হতে হবে

| বুধবার , ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব জনসংখ্যার কাঠামোয় ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটেছে। প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর তুলনায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বেশি হয়েছে। জন্মহার কমে যাওয়া এবং মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার কারণে এমন পরিবর্তন ঘটেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর এক নতুন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক দশক ধরে চলা দুটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার ফল এই পরিবর্তন। এর একটি হলো বিশ্বজুড়ে জন্মহার কমে যাওয়া, অন্যটি মানুষের আয়ু বৃদ্ধি। চিকিৎসাবিজ্ঞান, পুষ্টি, স্যানিটেশন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতির ফলে মানুষ আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি দিন বাঁচছে। অন্যদিকে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, দেরিতে বিয়ে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থার সহজলভ্যতার কারণে বিভিন্ন দেশে মানুষ কম সন্তান নিচ্ছে। ধনী দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, বিশ্বের জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়া ও জাপানে তুলনামূলকভাবে আগে এই পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যায়। রাশিয়ায় জনসংখ্যা কমতে শুরু করে ১৯৯৬ সালে। আর জাপানে জনসংখ্যা কমার প্রবণতা শুরু হয় ২০০৮ সালে। এরপর আরো কয়েকটি দেশ একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তবে বিশ্ব জনসংখ্যা এখনই কমে যাবে না বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্বের জনসংখ্যা আরো কয়েক দশক ধরে বাড়তে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি দীর্ঘদিন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। তবে এখন এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও দ্রুত এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

জনসংখ্যার এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে সমাজ, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। পরিবারে সদস্যসংখ্যা কমে আসার পাশাপাশি সন্তানহীন মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে প্রবীণদের দেখভালের বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্ধক্য সবার জন্যই কঠিন হতে পারে। তবে বার্ধক্যজনিত দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা, একা বসবাস করা এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল প্রবীণদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন।

এ পরিস্থিতিতে প্রবীণ মানুষের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে সরকারগুলোকে অর্থনৈতিক নীতি, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণদের যত্ন ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণ বয়সে যে বিষয়টির অভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় তা হলো সঙ্গ দেওয়া বা সময় দেওয়া। প্রতিদিনের ব্যস্ততার কারণে অনেকেই ঠিকঠাক মতো পরিবারের প্রবীণ সদস্যের খোঁজ নিতে পারেন না বা সময় দেওয়া হয় না। এটি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। একাকিত্ব প্রবীণদের বিষণ্ন করে তুলতে পারে, যা পরে তাদের স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বয়স হতে থাকলে অভিজ্ঞতার ঝুলিতে অনেক গল্প জমা হয় যা তারা বলতে চান। কিন্তু এই গল্প শোনার সময় আমাদের হাতে থাকে না। তাই প্রবীণদের সঙ্গ দিতে হবে। অন্যদিকে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মেজাজেরও পরিবর্তন হতে থাকে। কেউ কেউ অতিরিক্ত খিটখিটে হয়ে যান, আবার কেউ কথাবার্তা কমিয়ে ফেলেন, কারো আবার আচরণে ছেলেমানুষী ভাব চলে আসে। যে পরিবর্তনই আসুক না কেন, পরিবারের গুরুজন হিসেবে তাকে ভালো রাখার, তার পাশে থাকার দায়িত্ব আমাদের। অতএব, প্রবীণদের প্রতি নমনীয় হতে হবে, তাদের প্রতি সহনশীল আচরণ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি, স্বাস্থ্যসচেতনতা, পুষ্টির উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতার কারণে বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। সঙ্গে বেড়েছে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। কিন্তু এর সঙ্গে বেড়েছে প্রবীণদের সুস্থ রাখার চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে দেশে দেড় কোটির বেশি প্রবীণ রয়েছেন। তাঁদের প্রয়োজন বাড়তি যত্ন। প্রবীণদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় যেকোনো সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তাই প্রবীণদের বিষয়ে বেশি সচেতন ও যত্নবান হতে হবে।

তাঁরা বলেন, প্রবীণরা আমাদের সমাজের বোঝা নন, তারা অতীতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে অসামান্য অবদান রেখেছেন। আজ তারা দ্বিতীয় শিশুর মতো যত্ন ও সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখেন। তাই প্রবীণদের অবহেলা না করে, মর্যাদার সঙ্গে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। অসহায় প্রবীণদের বিষয়টি জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান, দানশীল ও সচেতন মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে