শুনেছি, কেউ যদি প্রকৃতি, নৌভ্রমণ আর গ্রামীণ বাংলাদেশের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তাহলে কিশোরগঞ্জ–বিশেষ করে নিকলী হাওর–একটি দারুণ গন্তব্য।
কিশোরগঞ্জের হাওর মানেই জল, আকাশ আর সবুজের অপূর্ব মিতালি। সেই জলভূমির বুকেই নিকলী উপজেলার ছাতিরচর–বর্ষায় যাকে মনে হয় বিশাল জলরাশির মাঝে ভেসে থাকা এক সবুজ দ্বীপ। সেই নিকলী হাওরই আজ আমাদের গন্তব্য। ভোর পাঁচটায় চোখ খুলে দেখি বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। একটু ধাক্কাই খেলাম। অন্য রুমের বন্ধুকে ঘুম থেকে তোলার জন্য ফোন করতেই সে বলল, “এই বৃষ্টিতে আমার মনে হয় না বের হওয়া ঠিক হবে।”
বন্ধুর এই হতাশ মার্কা কথাবার্তা আমার মোটেও পছন্দ হলো না। আমাদের রুমের তিনজন বিছানায় বৃষ্টি বিলাস না করে সময়মতো রেডি হয়ে গেলাম। ততক্ষণে বৃষ্টি বাড়ি চলে গেছে! অন্যরা বিছানার মায়া কাটিয়ে একটু দেরিতেই রেডি হলো। বৃষ্টি দেখে আমাদের পাইলটও সুযোগ নিতে ছাড়ল না–সেও লেট! এক কথায়, আমাদের রুমের তিন বান্দা ছাড়া সবাই লেট। তখন মনে হলো–সবাই নরমাল, আমরা তিন বান্দা একটু অ্যাবনরমাল!
ঈশ্বরকে স্মরণ করে বাহনে উঠে বসলাম। গাঙচিল রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা হলাম নিকলী হাওরের দিকে।
ঘাটের কাছাকাছি যেতেই চোখে পড়ল জলের মধ্যে দূরে দূরে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট একক বাড়ি। চারপাশে গাছগাছালি, প্রতিটি বাড়ির সামনে বাঁধা একটি করে নৌকা। দৃশ্যটা যেমন মুগ্ধ করছিল, তেমনি মনে হচ্ছিল–কী অসম্ভব কষ্টের জীবন হতে পারে এই মানুষগুলোর!
ঘাটে পৌঁছানোর আগেই সুন্দর একটা জায়গা দেখে সবাই নেমে পড়লাম ছবি তুলতে। হাওরের মধ্যে ঢালু, সরু চরের মতো জায়গা। কিন্তু নামবার মুখ হাজারখানেক সবুজ বাঁশের স্তূপ দিয়ে বন্ধ।
সম্ভবত জায়গাটা নিরাপদ নয় বলেই এমন ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের তো যেতেই হবে–চট্টগ্রাম থেকে গিয়েছি বলে কথা!
বাঁশের স্তূপের পাশ দিয়ে লটকে লটকে নিচে নেমে গেলাম। চারদিকে কোনো জনমানব নেই। হঠাৎ মনে হলো–বাংলা সিনেমার একটা নাচের শুটিং এখানেই হয়ে যাক!
দুই মিনিটে রিহার্সেল, চার মিনিটে “কাঁঙ্খের কলসি আমার গেল রে ভাসি”–সখী সমেত নায়ক–নায়িকার নাচের শটও শেষ!
দেরি হয়ে যাচ্ছিল। তাই গাড়িতে উঠে এক টানে নিকলী বেড়িবাঁধ।
সারি সারি সুসজ্জিত বোট। মাইকে উচ্চশব্দে চটুল গান। সেই গানের তালে তালে অঙ্গপ্রত্যঙ্গও অটোমেটিক দুলতে শুরু করল! চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে সার্থক করছিলাম দুনয়ন। হাওরের জলের মাঝে ছোট ছোট গাছগাছালি ঘেরা বাড়িগুলো সত্যিই দৃষ্টি আটকে রাখার মতো। এবারের গন্তব্য ছাতিরচর।
একটা বড় দোতলা বোট ভাড়া করে টপাটপ উঠে পড়লাম। বাজার করা নেই, রান্না নেই, অফিস নেই, খাওয়ার চিন্তা নেই–সবচেয়ে বড় কথা, কোনো কাজে বাধা দেওয়ার কেউ নেই! মনোরম আবহাওয়ায় শুধু ভাসছি।
চারপাশে শুধু জল আর জল। সাদা সাদা তুলোর মত মেঘ সমেত নীল আকাশটা যেন নেমে এসেছে হাওরের জলে। কোথাও মাছ ধরার নৌকা, কোথাও পর্যটকবাহী সুসজ্জিত বোট, কোথাও জেলেদের ব্যস্ততা, কোথাও জলের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ গাছপালা। দুহাত দুদিকে প্রসারিত করে নৌকার গলুইয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশের বিশালতা অনুভব করার বৃথা প্রয়াস চালালাম। পাশ ফিরে মনে হচ্ছিল, আমি যেন জলরাশির ওপর চিৎ সাঁতার কেটে ঢেউয়ের তালে তালে ভেসে চলেছি। এ যেন বিশাল এক জলের বিছানা! হঠাৎ চোখে পড়ল হালকা গোলাপি রাঙের ফুলে ভরা পাতাবিহীন একটি গাছ। জলের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটা যেন বিশাল এক ফুলদানিতে সাজানো ফুলের তোড়া।
ছাতিরচরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্যগুলোর একটি করচ বন। জলের ধারে সারি সারি করচ গাছ যেন পুরো গ্রামটিকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই চোখে পড়ল সরু বাঁশের সাঁকো। ছোট ছোট বাচ্চারা বানরের মতো অনায়াসে ঝুলছে ,ছুটে বেড়াচ্ছে তার ওপর দিয়ে। কেউ কেউ আবার জন্মের সময় মাতৃক্রোড় থেকে পাওয়া টংটং পোশাকে ঝুপ্পুশ করে লাফিয়ে পড়ছে জলে, ওদের চোখেমুখে এতটুকু সংকোচের বালাই নেই!
গাছ ধরে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছিলাম না–গাছ দুলছে, নাকি আমি দুলছি! এখন ভাবছি আমার মাথাটাই না যেন ঘুরছিল তখন! জলে দুলতে থাকা গাছ আর পাতার প্রতিবিম্ব দেখে সত্যিই অভিভূত হতেই হবে। প্রকৃতি যেন তার মন–প্রাণ উজাড় করে আমাদের সব দিয়ে দিয়েছে। শুধু প্রয়োজন আমার আপনার সবার একটু যত্ন।
তবে ছাতিরচর শুধু সৌন্দর্যের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন–সংগ্রামের গল্পও। বছর দু–তিন আগে ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’ সিনেমাটা দেখেছিলাম। মনে হয়েছিল–এ যেন সিনেমা নয়, একেবারে প্রামাণ্যচিত্র। হাওরের সৌন্দর্যের আড়ালে মানুষের কষ্ট, ক্ষুধা, ভালোবাসা আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম এত বাস্তবভাবে দেখানো হয়েছিল যে, হাওরে ঘুরতে গিয়ে থেকে থেকেই সেই দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। একদিকে অপরূপ প্রকৃতি, অন্যদিকে সেই প্রকৃতির বুকেই মানুষের কঠিন জীবনযুদ্ধ–দুটি বিপরীত বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। খোলা আকাশের নিচে রৌদ্রজ্বল হাওর। কোথাও কোনো ছায়া নেই। শুধু করচ‘ বনের কারণে এই জায়গাটুকু ছায়াশীতল। প্রখর রোদে ছাতা যেমন আমাদের ছায়া দেয়, করচ বনও তেমনি জায়গাটাকে ছায়ায় ঢেকে মায়াময় করে তুলেছে।
জানি না, ছাতিরচর নামকরনকর আসল গল্প কী। তবে আমার মনে হলো–এই করচ বনটাই যেন ছাতার মতো পুরো চরটাকে আগলে রেখেছে,আর তাই বোধকরি এর নাম ‘ছাতিরচর’। জল, আকাশ, সবুজ আর মানুষের জীবন–সব মিলিয়ে ছাতিরচর আমার কাছে শুধু একটি ভ্রমণগন্তব্য নয়; বাংলাদেশকে একটু অন্যভাবে দেখার, অনুভব করার একটি জায়গা।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গল্পকার












