আসল নকল হুবহু এক। খোলা চোখে তো দূরের কথা, কম্পিউটারে স্ক্যান করেও ধরা কঠিন। শুধু সরকারি সিল এবং কর্মকর্তার নাম–পদবিতে গোলমাল করে ফেলে। এরপরও অভিজ্ঞ কোনো পুলিশ কর্মকর্তা না হলে এই নকল ধরা কঠিন। এটি চট্টগ্রামের পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের গল্প, রীতিমতো ‘দুর্ধর্ষ’। সরকারি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে তৈরি করা হচ্ছিল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ। জাল সনদকে আসল হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ব্যবহার করা হচ্ছিল কিউআর কোড। শুধু তাই নয়, কিউআর কোড স্ক্যান করলে যাতে সন্দেহের কোনো কারণ না থাকে, সেজন্য বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইট ক্লোন করে সাথে দুই–তিনটি অন্য শব্দ লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে নকল ওয়েবসাইটও। ফলে সাধারণভাবে সনদটি যাচাই করে সেটি জাল বোঝার কোনো উপায় ছিল না। মামলার কারণে বিদেশ যেতে পারছেন না এমন বিদেশগামী বা দেশ ছাড়তে চাচ্ছেন এমন নাগরিকের কাছ থেকে এসব জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য নেওয়া হতো প্রায় সোয়া লাখ টাকা।
এমন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। গত রোববার গভীর রাতে চট্টগ্রাম নগর ও বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জেলা বিশেষ শাখা (ডিএসবি) ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তাররা হলেন মো. আশরাফ আলী খান (৩৬), মো. নিশান (৩৬), মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন (৪৮) ও মো. আবদুর রহমান (৪৬)। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার চারজন মূলত দালাল হিসেবে কাজ করতেন। চক্রে অনলাইনে নকল কিউআর কোড ও ওয়েবসাইট তৈরিতে দক্ষ আরো কয়েকজন রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশে চাকরি, পড়াশোনা কিংবা অভিবাসনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি নাগরিকদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ প্রয়োজন হয়। ব্যাংক চালানের মাধ্যমে নির্ধারিত সরকারি ফি ব্যাংকে জমা দিয়ে অনলাইনে আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই–বাছাই করে এই সনদ দেয়। স্থানীয় পুলিশের তৈরি এই সনদ ঘুরে আসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। ফলে একটি লাইসেন্স পেতে গড়ে এক মাসের মতো সময় লাগে। কিন্তু আবেদনকারীর বিরুদ্ধে যদি ফৌজদারি কোনো মামলা থাকে তাহলে তিনি এই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পান না। এই ধরনের কেসগুলোতে প্রতারক চক্র লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে নকল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ তুলে দিচ্ছে।
চক্রটির প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে বাঁশখালীর এক বাসিন্দার পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বাঁশখালীর জাকির হোসেনের বিদেশ যাওয়ার জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন হয়। তবে তার বিরুদ্ধে থানায় একটি ফৌজদারি মামলা থাকায় তিনি সরাসরি পুলিশের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করেননি। পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি বাঁশখালীর একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কর্মরত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে আবদুর রহমান নামের এক ব্যক্তি দ্রুত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। এজন্য জাকির হোসেনের কাছ থেকে ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা দাবি করা হয়। ২১ জুলাই তিনি ৮০ হাজার টাকা অগ্রিম দেন। এরপর ১২ আগস্ট তাকে একটি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ দেওয়া হয়। সনদটি হাতে পাওয়ার পর বাকি টাকা পরিশোধ করেন তিনি।
সনদটি দেখতে ছিল অনেকটা আসল পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের মতো। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ও সিল ছিল। ছিল কিউআর কোডও। সনদটি যাচাই করতে কিউআর কোড স্ক্যান করলে বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি একটি ওয়েবসাইটে সনদের তথ্যও প্রদর্শিত হচ্ছিল। ফলে সাধারণভাবে দেখলে সনদটি জাল বলে বোঝার কোনো সুযোগ ছিল না। একই কাগজ, একই হরফ, একই কিউআর কোড। তবে পুলিশ সুপারের নামের বানান ও পদবী ভুল। বিষয়টি এত সূক্ষ্মভাবে করা হয়েছে, এই সনদ যে জাল তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন ছিল।
পুলিশ জানায়, জাকির হোসেন সনদটি একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে জমা দেওয়ার পর জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর তিনি চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। তার ভাই নূর হোসেনের করা অভিযোগের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা করা হয়।
অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে নামে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের নির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা শাখা ও বিশেষ শাখার সদস্যরা সনদটি পরীক্ষা করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গতিবিধি, যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন এবং প্রযুক্তিগত বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তদন্তের একপর্যায়ে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। পরে বাঁশখালী ও চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) জুনায়েদ কাউসার জানান, চক্রটিতে কয়েকটি স্তরে লোকজন কাজ করে। কয়েকজন দালাল হিসেবে বিদেশগামী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা সংগ্রহ করেন। অন্য একটি অংশ অনলাইনে জাল সনদ, কিউআর কোড ও ওয়েবসাইট তৈরির কাজ করে। গ্রেপ্তার ৪ জন মূলত দালাল। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশের তদন্তে চক্রটির প্রতারণার একটি চমকপ্রদ দিকও উঠে এসেছে। জাকির হোসেনের কাছ থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার নামে নেওয়া হয় ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা। অথচ জাল সনদ তৈরি, কিউআর কোড এবং নকল ওয়েবসাইটে সনদটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে চক্রটির খরচ হয়েছে মাত্র ৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক ব্যক্তির কাছ থেকেই প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা লাভ করেছে চক্রটি।
জেলা পুলিশ জানায়, প্রযুক্তির ব্যবহার করে জাল সনদটিকে এমনভাবে বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যাতে কিউআর কোড স্ক্যান করেও কেউ সহজে সন্দেহ করতে না পারেন। প্রকৃত সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি করা নকল ওয়েবসাইটে সনদের তথ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকায় যাচাইকারী ব্যক্তিও প্রথম দেখায় সেটিকে বৈধ বলে মনে করতে পারেন।
পুলিশের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সরকারি নথি। দেশে এটির তেমন প্রয়োজন না হলেও বিদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের আইনগত অবস্থার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে।
পুলিশ বলছে, এ ধরনের জালিয়াতি শুধু সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বিদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা পড়লে বাংলাদেশের সরকারি নথির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারি নথি জালিয়াতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কোনো দালাল বা অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে সনদ নেওয়া উচিত নয়। নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ায় আবেদন করে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নেওয়ার জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কেউ দ্রুত সনদ করে দেওয়ার কথা বলে অস্বাভাবিক অংকের টাকা দাবি করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
এদিকে গ্রেপ্তার ৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত এবং তারা আর কতজনকে এভাবে জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে পুলিশ। চক্রটির সঙ্গে জড়িত অনলাইনভিত্তিক কারিগরি সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলে জেলা পুলিশ জানিয়েছে।












