পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পরমাণু শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশ। গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টার পর আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হয় বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নাম লেখাল। খবর বিডিনিউজের।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সভাপতিত্বে স্বয়ংক্রিয় সুইচ টিপে এ জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। তার বক্তব্যের পর প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কিত একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমকে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো। আমরা নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছি। রূপপুরের এই বিদ্যুৎ শুধু পাবনা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র বদলে দেবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রুশ পরমাণু শক্তি কর্পোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বক্তব্য দেন। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা থেকে অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি। তিনি বাংলাদেশের এ মাইলফলক অর্জনকে বৈশ্বিক পারমাণবিক শক্তির নিরাপদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে সাধুবাদ জানান।
প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
উদ্বোধন পর্ব শেষে অতিথিরা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার পর এখন পরবর্তী ধাপের কারিগরি পরীক্ষা–নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে; যা দেশকে চূড়ান্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে নিয়ে যাবে। এর আগে দুপুরে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল হেলিকপ্টারে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছান। তাদের উপস্থিতিতে পারমাণবিক চুল্লিতে ফুয়েল স্থাপনের কাজ শুরু হয়।
উৎপাদনের প্রাথমিক এ প্রক্রিয়াকে প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলছেন পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান শৌকত আকবর। তার ভাষ্য, ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মাধ্যমে দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল পর্যায়ে প্রবেশ করছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভৌত যাত্রা; যেখানে চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি উৎপাদন শুরু হয়।
ফুয়েল লোডিং এবং আনুষঙ্গিক পরীক্ষা শেষে সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ বা আগস্ট মাসের দিকে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে এ কেন্দ্র থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মাতীরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পে দুটি ইউনিট থেকে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থা রসাটমের প্রকৌশল বিভাগ জেনারেল কন্ট্রাকটর হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালনে প্রয়োজনীয় গ্রিড লাইনও প্রস্তুত হয়েছে বলে গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ–পিজিসিবি জানিয়েছে।
ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়া : ইউরেনিয়াম ফুয়েল লোডিং হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চূড়ান্ত কারিগরি প্রক্রিয়া। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা, গ্যাস বা তেলের বদলে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামের ছোট ছোট পেলেট ব্যবহার করা হয়, যার প্রতিটি সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে।
এই পেলেটগুলোকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি টিউবের ভেতর সাজিয়ে ‘ফুয়েল অ্যাসেম্বলি’ তৈরি করা হয়। এই অ্যাসেম্বলিগুলোকে রিঅ্যাক্টরের ভেতর স্থাপন করার প্রক্রিয়াই হলো ফুয়েল লোডিং। এটি সম্পন্ন হওয়ার পরই বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ফিশন বা চেইন রিঅ্যাকশন (চুল্লিতে তাপ উৎপাদন) শুরু করা সম্ভব হয়।
ফুয়েল লোডিং একটি অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। একটি বিশেষ ফুয়েল লোডিং মেশিন বা রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে এই কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে এ প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে।














