পা পিছলে আলুর দম

ইসমাইল জসীম | বুধবার , ২৯ জুলাই, ২০২৬ at ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ

আষাঢ়ের সকাল। ভোরের আকাশ যেন সারা রাত ধরে জমিয়ে রাখা মেঘের ভার আর ধরে রাখতে পারছিল না। দূরের তালগাছের মাথায় কুয়াশার মতো সাদা মেঘ ঝুলে আছে। হঠাৎ এক ঝলক বাতাস এসে বাঁশবনে ঝাপিয়ে পড়লো। দোল খাচ্ছে পাপড়িগুলো যেনো সাদা সাদা বকের সারি মেতো উঠলো কলকাকলিতে। তারপরই শুরু হলো বৃষ্টি প্রথমে টুপটাপ, তারপর ঝমঝম, সবশেষে আকাশের সব মেঘ বৃষ্টির নদী হয়ে একসঙ্গে আছড়ে পড়লো মাটিতে।

বৃষ্টির গন্ধে ভরে গেল চারপাশ। ভেজা মাটির সেই সোঁধা গন্ধ, আমগাছের পাতায় জমে থাকা জলের ফোঁটা, পুকুরের জলে বৃষ্টির অসংখ্য বৃত্ত, আর দূরে ব্যাঙের একটানা ডাক সব মিলিয়ে গ্রামটা আজ নিজেকে সাজিয়ে নিলো অপরূপ সাজে ।

রায়হান বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। সামনে পরীক্ষা। বই খোলা ছিল টেবিলে কিন্তু পড়ায় মন বসার কোনো উপায় নেই। বাইরে তার বন্ধুরা চিৎকার করছে।

-‘রায়হান! খাল দেখতে যাবো, গেলে আয়। বৃষ্টির পানিতে খাল ভরে গেছে!

মায়ের চোখ এড়িয়ে সে দৌড়ে বেরিয়ে পড়ল। পা দুটো কাদাপানিতে ডুবে যাচ্ছে, তবু কী আনন্দ! কাঁচা রাস্তা ধরে ছুটতে ছুটতে সে পৌঁছাল গ্রামের বড়ো খালের ধারে। খালটি বর্ষার জলে ফুলেফেঁপে উঠেছে। দুই তীর ছুঁয়ে জল বয়ে চলেছে। স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে কচুরিপানা, শুকনো ডাল, কোথাও বা ছোট্ট কাগজের নৌকা।

ইফাজ, ইরাজ আর ইভান আগেই এসে হাজির।

চল, দেখি কার নৌকা সবচেয়ে দূর যায়!’

কয়েক মিনিটের মধ্যেই যে যার মতো করে একগাদা পাতার নৌকা তৈরি করে নিলো। কেউ নৌকার মাথায় নিজের নাম লিখল, কেউ আবার পাতার ছোট্ট পতাকা লাগিয়ে দিল।

একটার পর একটা নৌকা ভেসে চলল স্রোতের সঙ্গে। তারা দৌড়তে লাগলো নৌকার সাথে সাথে। হার কিন্বা জিত নয়, নৌকার সঙ্গে ছুটে চলার আনন্দটাই যেন তাদেও কাছে সবচেয়ে বড়ো।

তারপর শুরু হলো আরও দুরন্তপনা। রাস্তার ধারে জমে থাকা বড়ো বড়ো পানির গর্তে ঝাঁপিয়ে পড়া, একে অপরের গায়ে কাদা ছোড়া, স্কুল মাঠের কাদাজলে ফুটবল খেলতে গিয়ে বারবার পিছলে পড়া হাসির শব্দে চারপাশ মুখর হয়ে উঠল।

বৃষ্টি কিছুটা কমেছে। মেঘের ফাঁক দিয়ে হালকা আলো বেরোচ্ছে। ঠিক সেই সময় তারা দেখতে পেল, পাশের ধানখেতের আলের পাশে একটা ছোট্ট শালিকের ছানা কাদায় পড়ে ছটফট করছে। হয়তো ঝড়ে বাসা থেকে পড়ে গেছে।

রায়হান আস্তে করে তাকে তুলে নিল। ছানাটার ডানা ভিজে গেছে, চোখে ভয়।

বন্ধুরা মিলে কাছের একটা ঝোপের আড়ালে নিরাপদ জায়গায় শুকনো খড় দিয়ে ছোট্ট আশ্রয় বানিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর মাশালিক এসে গাছের ডালে বসে ডাকতে লাগল। সবাই দূরে সরে দাঁড়াতেই পাখিটি উড়ে এসে ছানার পাশে বসল।

তারা একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। বিকেলের দিকে বৃষ্টি একেবারে থেমে গেল। পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো পড়তেই ভেজা পাতাগুলো সোনার মতো ঝলমল করতে লাগল। ধানক্ষেতের ওপর হালকা কুয়াশার মতো বাষ্প উঠছে। দূরে নদীর ওপরে বাঁকা হয়ে ফুটে উঠল সাতরঙা রংধনু।

বাড়ি ফেরার পথে রায়হানের জামা কাদায় মাখামাখি, চুল থেকে এখনও পানি ঝরছে। উঠোনে পা দিতেই রায়হান দেখে তার মা রাগমূর্তি হয়ে বেত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। -‘আজ আসুক রায়হান, মেরে পিঠের ছাল যদি তুলে না নিই আমি আজ অমুকের ঝি না’।

মাকে দেখে রায়হান মনে মনে ভাবলো ‘আজ তো আর রক্ষে নেই।’ ভয়ে বুক কাঁপছে রায়হানের।

মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে গিয়ে অমনি উঠোনোর কাদায় একবারেই ‘পা পিছলে আলুর দম’।

কোথায় মায়ের রাগ আর কোথায় রায়হানের ভয়।

মা তাড়াতাড়ি ছেলেকে কাদামাখা শরীরে ধরতে গিয়ে নিজেই ভিজে একাকার। চারদিকে হাসির রোল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদাদুর ছাতা
পরবর্তী নিবন্ধএলিয়েন বিজ্ঞানের অমীমাংসিত প্রশ্ন