পরিবর্তনশীল বিশ্ব এবং আধুনিক শিক্ষক

ড. শামসুদ্দীন শিশির | সোমবার , ৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

আমরা সকলেই জানি শ্রেণিকক্ষ থেকেই ওঠে আসে আমাদের আগামীর সমৃদ্ধ দেশ, সমৃদ্ধ পৃথিবী। সেই শ্রেণিকক্ষের প্রধান সেনাপতি ‘শিক্ষক’। ‘শিক্ষকতা’ শুধু একটি পেশার নাম নয়; এটি মানুষ গড়ার এক মহান দায়িত্বের প্রতিশব্দ। একটি শিশুর চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন জাগানো, তাকে জ্ঞান ও মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করা এবং সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কাজে শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত ভূমিকা রেখে চলেছেন। একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তি নির্মাণে শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তা, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি পেশাকে সম্মান জানানো নয়; বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। একজন শিক্ষক যখন চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পেশাগত সম্মান নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন, তখন তাঁর ওপর শিক্ষার্থীদের শেখানোর পাশাপাশি নানা ধরনের মানসিক চাপও তৈরি হয়। ফলে শিক্ষার গুণগত মানের সঙ্গে শিক্ষকের কর্মপরিবেশের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

পেশাগত সুরক্ষা বলতে শুধু চাকরি স্থায়ীকরণ বা আর্থিক নিরাপত্তা বোঝায় না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ন্যায্য নিয়োগপ্রক্রিয়া, উপযুক্ত বেতন–ভাতা, অবসরকালীন সুবিধা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা–উপকরণ পাওয়ার অধিকার। শিক্ষক যেন ভয় বা অনিশ্চয়তার পরিবর্তে আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে পারেন পেশাগত সুরক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সেটিই।

বিশেষ করে অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক, খণ্ডকালীন কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই দায়িত্ব পালন করেও যদি কোনো শিক্ষক বৈষম্যমূলক সুযোগ–সুবিধার মুখোমুখি হন, তাহলে তা শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই উদ্বেগের বিষয়।

শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের জন্য প্রতিবছর একটি দিবস পালন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তাঁর দৈনন্দিন কর্মজীবনের বাস্তবতায়। সমাজে শিক্ষককে কতটা সম্মান করা হয়, তাঁর মতামত নীতিনির্ধারণে কতটা গুরুত্ব পায়, তাঁর পেশাগত সিদ্ধান্তকে কতটা মূল্য দেওয়া হয় এবং তাঁর শ্রমের যথাযথ প্রতিদান দেওয়া হয় এসবই শিক্ষকের মর্যাদার বাস্তব সূচক।

শিক্ষকদের কেবল নির্দেশ বাস্তবায়নকারী হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁরা শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অংশীদার। পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষকদের মতামতকে নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রতি সামাজিক আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন দরকার। শিক্ষককে সম্মান করা মানে তাঁর ব্যক্তিসত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা ও শ্রমের মূল্যকে সম্মান করা। একজন শিক্ষকও একজন কর্মজীবী মানুষ তাঁর বিশ্রাম, ব্যক্তিগত জীবন, মানসিক স্বস্তি এবং পেশাগত বিকাশের অধিকার রয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন শিক্ষা এবং বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রযুক্তি দ্রুত বদলে দিচ্ছে শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা। এই পরিবর্তনকে শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে না দেখে শিক্ষকের সক্ষমতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য অনুসন্ধান, পাঠ পরিকল্পনা, মূল্যায়ন কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর আবেগ বোঝা, তার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা কিংবা মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা এখনও অনন্য। প্রযুক্তি জ্ঞান দিতে পারে; কিন্তু জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার মানবিক প্রক্রিয়ায় শিক্ষক অপরিহার্য।

তাই ভবিষ্যতের শিক্ষককে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার পরিবর্তে প্রযুক্তিকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এজন্য শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। ভবিষ্যতের শিক্ষা কেমন হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করবে আজ আমরা শিক্ষকদের জন্য কী ধরনের পরিবেশ তৈরি করছি তার ওপর। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নকে এককালীন প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ধারাবাহিক শিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

একজন শিক্ষক যেন নতুন শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারেন, সহকর্মীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারেন, গবেষণায় যুক্ত হতে পারেন এবং নিজের পেশাগত দক্ষতা উন্নত করতে পারেন এমন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা ও প্রণোদনার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষকদের কর্মভারও পুনর্বিবেচনা করা দরকার। একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের শেখানো ও তাদের বিকাশে সহায়তা করা। কিন্তু অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং বিভিন্ন ধরনের আনুষঙ্গিক দায়িত্ব যদি শিক্ষাদানের সময় ও মনোযোগ কমিয়ে দেয়, তাহলে তা শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং দায়িত্বের যৌক্তিক বণ্টনের মাধ্যমে শিক্ষকদের মূল পেশাগত কাজে মনোনিবেশের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো কোনো স্লোগান নয়। পাশে দাঁড়ানো একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এর অর্থ হলো তাঁদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, কর্মপরিবেশ নিরাপদ করা, পেশাগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। একজন শিক্ষকের প্রতি সম্মান শুধু ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো বা বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বক্তব্য দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শিক্ষক যখন ন্যায্য বেতন পান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ পান, সময়মতো পদোন্নতি ও প্রাপ্য সুবিধা পান, প্রশিক্ষণের সুযোগ পান এবং তাঁর পেশাগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করা হয় তখনই শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার বাস্তব অর্থে পূর্ণতা পায়।

এক্ষেত্রে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক সংগঠন, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং বৃহত্তর সমাজ সবার দায়িত্ব রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব কার্যকর নীতি ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা; প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের দায়িত্ব সহায়ক কর্মপরিবেশ তৈরি করা; অভিভাবকদের দায়িত্ব শিক্ষকের পেশাগত ভূমিকাকে সম্মান করা; আর শিক্ষকদের দায়িত্ব নিজেদের পেশাগত দক্ষতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা অব্যাহত রাখা।

জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, বৈশ্বিক বৈষম্য, শিক্ষার্থীদের পরিবর্তিত মানসিক ও সামাজিক প্রয়োজন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মবাজার সবকিছুই শিক্ষকতার ধরনকে প্রভাবিত করছে। ফলে আগামী দিনের শিক্ষককে শুধু বিষয়জ্ঞানসম্পন্ন হলেই চলবে না; তাঁকে হতে হবে পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজিত, প্রযুক্তিসচেতন, মানবিক এবং আজীবন শিক্ষার্থী।

এই পরিবর্তনের জন্য শিক্ষকদের প্রস্তুত করার দায়িত্বও শিক্ষা ব্যবস্থার। তাঁদের ওপর নতুন দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সময়, সম্পদ ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

শুরুতেই উল্লেখ করেছি একটি জাতির ভবিষ্যৎ শ্রেণিকক্ষে নির্মিত হয়, আর সেই শ্রেণিকক্ষের অন্যতম প্রধান নির্মাতা শিক্ষক। তাই শিক্ষকদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করা। তাঁদের মর্যাদা উন্নত করা মানে জ্ঞান, মানবিকতা ও মূল্যবোধের মর্যাদা বৃদ্ধি করা। আর তাঁদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা মানে সমাজের ভবিষ্যৎকে আরও টেকসই করা।

লেখক: শিক্ষা চিন্তক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলেখকের দরকার সৃজনশীল পরমায়ু
পরবর্তী নিবন্ধকুষ্টিয়ায় লালন আখড়ায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িতে হামলা