পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও নাগরিক প্রত্যাশা

চট্টগ্রামের আসল উন্নয়ন

মো. নাজমুল ইসলাম চৌধুরী | বৃহস্পতিবার , ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম শুধু একটি নগর নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, বন্দর, শিল্প, পর্যটন, বাণিজ্য ও সম্ভাবনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। পাহাড়, নদী, সাগর, সবুজ ও ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই নগরকে একটি বাসযোগ্য, নান্দনিক, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক মহানগর হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক প্রত্যাশাগুলোর একটি।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর নগর পরিকল্পনা, অবৈধ স্থাপনা, কারপার্কিং, ফুটপাতনালা দখল, নির্মাণবিধি বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে যে সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন, তা নগরবাসীর মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা তৈরি করেছে। জুনে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সমপ্রতি সিডিএ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান ২০২৫২০৫০এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। প্রায় ১,২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে পরিকল্পনার আওতায় রেখে টেকসই, আধুনিক ও পরিকল্পিত মহানগর গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোচূড়ান্ত করার আগে নাগরিকদের মতামত গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে!

সিডিএ চেয়ারম্যানের একটি বক্তব্য এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক– “চট্টগ্রামকে একটি পরিকল্পিত, আধুনিক ও সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।”

এটি কেবল একজন চেয়ারম্যানের বক্তব্য নয়; এটি চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের আকাঙ্‌ক্ষার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ !

উন্নয়ন মানেই শুধু রাস্তাভবন নয় :

চট্টগ্রামের আসল উন্নয়ন বলতে শুধু নতুন রাস্তা, ফ্লাইওভার, ভবন কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনা বোঝালে চলবে না। উন্নয়নের সঙ্গে থাকতে হবেজলাবদ্ধতামুক্ত নগর, কার্যকর ড্রেনেজ, পাহাড় ও জলাধার সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা, ফুটপাত ও পথচারীবান্ধব সড়ক, আধুনিক গণপরিবহন, নিরাপদ আবাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, নান্দনিক নগরস্থাপত্য এবং নাগরিক নিরাপত্তা। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনেও বড় প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে এসেছে; তবে প্রকল্পের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে। সুতরাং এখন প্রয়োজন প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন থেকে ব্যবস্থাপনানির্ভর টেকসই উন্নয়নে যাওয়া।

প্রয়োজন সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা :

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের পরিকল্পিত নগরায়ণ ও মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের নাগরিকসেবামুখী উন্নয়ন এবং অন্যান্য সংস্থার কর্মকাণ্ডের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ই পারে চট্টগ্রামের উন্নয়নকে আরও টেকসই, গতিশীল ও জনবান্ধব করতে। চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা্তসমন্বিত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে উঠুক পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নান্দনিক ও সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য চট্টগ্রাম!

চট্টগ্রামের উন্নয়ন কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব নয়। সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সড়ক ও জনপথ, ট্রাফিক বিভাগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। সিডিএ চেয়ারম্যান এবং মেয়র নিজেও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং নগর উন্নয়নকে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে পরিচালনার কথা বলেছেন।

এখানে চট্টগ্রামবাসীরও দায়িত্ব রয়েছে। নালাখালে বর্জ্য ফেলা, ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ, পাহাড় কাটা কিংবা জলাধার ভরাটের বিরুদ্ধে নাগরিক সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ টেকসই নগর শুধু সরকারের প্রকল্পে তৈরি হয় না্তসরকার, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্বশীলতায় তৈরি হয়।

উন্নয়নের সঙ্গে থাকতে হবে গবেষণা ও জনসম্পৃক্ততা :

চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, স্থপতি, পরিবেশবিদ, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, সাংবাদিক, পর্যটন বিশেষজ্ঞ, বন্দর ও শিল্পখাতের প্রতিনিধি, লেখকসাহিত্যিকশিল্পী এবং সাধারণ নাগরিকদের মতামতও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে নাগরিক অংশগ্রহণ, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত জনসম্মুখে অগ্রগতি প্রকাশ করা হলে মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।

বন্দর ও পর্যটননগর হিসেবে চট্টগ্রামের নতুন পরিচয় :

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। একই সঙ্গে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, কর্ণফুলী নদী, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পার্বত্য অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে এর পর্যটন সম্ভাবনাও বিশাল। তাই আগামী দিনের নগর পরিকল্পনায় বন্দরশিল্পবাণিজ্যপর্যটনপরিবেশআবাসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ও নগর কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। চট্টগ্রাম চেম্বার ও শিল্পখাতের সঙ্গে নগর পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটনকে কেন্দ্র করে নান্দনিক ও পরিচ্ছন্ন পাবলিক স্পেস তৈরি করা গেলে চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও শক্তিশালী হবে।

প্রিয় বেলায়েত ও ডা. শাহাদাত ভাই, আপনাদের সামপ্রতিক উদ্যোগ ও সক্রিয়তা নগরবাসীর মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। চট্টগ্রামবাসীর আন্তরিক ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও দোয়া অবশ্যই তাদের জন্যই থাকবে, যারা দলমত ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নগরের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন। তবে প্রশংসার পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রত্যাশাও স্পষ্ট। উন্নয়ন হোক পরিবেশ ও সমাজবান্ধব; পরিকল্পনা হোক বিজ্ঞানভিত্তিক; বাস্তবায়ন হোক স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক; আর চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হোক নাগরিকের অংশগ্রহণে। চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী, খাল, জলাধার, সবুজ, ঐতিহ্য ও উন্মুক্ত স্থান রক্ষা করে যদি পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা যায়, তবে উন্নয়ন শুধু দৃশ্যমান হবে নাতা মানুষের জীবনমানেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

চট্টগ্রামের জনগণ, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী, গবেষক, উন্নয়নকর্মী, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম, সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ, পর্যটনশিল্প, বন্দর ও শিল্পবাণিজ্য খাত, লেখকসাহিত্যিকশিল্পী, পরিবেশ আন্দোলনকারী এবং সর্বস্তরের নাগরিকের প্রতি আহ্বান চট্টগ্রামের উন্নয়নকে দলীয় বা ব্যক্তিগত বিতর্কের গণ্ডিতে না রেখে জনস্বার্থ, পরিবেশ, অর্থনীতি, সৌন্দর্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারএই পাঁচটি ভিত্তির ওপর দাঁড় করাই হোক আমাদের সম্মিলিত নাগরিক আন্দোলন।

মূল কারণ– ‘চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উন্নয়ন।’

আর আমাদের প্রত্যাশা একটাই– ‘একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ, জলাবদ্ধতামুক্ত, যানজটসহনীয়, নান্দনিক, নিরাপদ, পরিকল্পিত ও মানবিক চট্টগ্রাম।’ প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ও ডা.শাহাদাত হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট সকল দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা, শুভকামনা ও সহযোগিতার প্রত্যাশা। চট্টগ্রাম হোক উন্নয়নের মডেলশুধু নির্মাণে নয়, পরিকল্পনা, পরিবেশ, সৌন্দর্য ও নাগরিক জীবনের সার্বিক কল্যাণ, টেকসই উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সবার আন্তরিক ভালোবাসা প্রত্যাশা করছি।

লেখক : পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনগরের নেপথ্যের সবুজ জীবন-সংকট, দখল ও সংরক্ষণের নতুন দর্শন
পরবর্তী নিবন্ধব্লু ইকোনমি: সম্ভাবনার সমুদ্র থেকে সমৃদ্ধির পথে চট্টগ্রাম