পদ্মা অয়েল কোম্পানির প্রায় এক কোটি টাকা দামের জেট ফুয়েল গায়েব করে দেওয়ার বহুল আলোচিত ঘটনায় কোম্পানির এভিয়েশন শাখার ম্যানেজারকে লোপাটকৃত তেলের দাম কোম্পানিতে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একইসাথে কয়েকমাস ধরে সাময়িক বরখাস্ত থাকা ম্যানেজার সাইদুল হককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের গোদলাইল ডিপো থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে নেওয়ার পথে বিমানের জ্বালানি তেলগুলো গায়েব করে দেয়া হয়েছিল। গত ১১ মার্চ গোদনাইল ডিপো থেকে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর উদ্দেশ্যে পাঠানো চারটি ট্যাংক লরিভর্তি ৭২ হাজার লিটার বিমানের জ্বালানি তেল রহস্যজনকভাবে উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে দীর্ঘ তদন্ত এবং কোম্পানির আইন অনুসরণ করেই ম্যানেজারকে তেলের দাম ফেরত দেয়ার নির্দেশ এবং বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। গতকাল এই সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পদ্মা অয়েল সূত্রে জানা গেছে, ১১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো থেকে পৃথক চালানে মোট ১৭৭টি ট্যাংক লরিতে বিমানের জ্বালানি তেল ঢাকার কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে পাঠানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ট্যাংক লরি ডিপো এলাকায় প্রবেশের আগে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের এডিসি মেইন গেটে এবং পরে পদ্মা অয়েলের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর নিজস্ব গেটে পৃথক দুটি রেজিস্ট্রারে গাড়ির নম্বর লিপিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু সেদিন ১৭৭টি ট্যাংক লরির মধ্যে ১৭৩টি ডিপোতে প্রবেশের প্রমাণ মিললেও ১৮ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার চট্ট মেট্রো–ঢ–৪১–৭০০, ঢাকা– ঢ–৪২–০২৫২, ঢাকা মেট্রো–ঢ–৪১–০৬৪৯ এবং ঢাকা মেট্রো–ঢ–৪১–০৬৯৮ নম্বরের চারটি ট্যাংক লরি গোদনাইল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে বের হলেও সেগুলো কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে পৌঁছেনি। কিন্তু ডিপোর রেজিস্ট্রারে সন্ধ্যা ৭টা ২৫, ৭টা ২৭, ৭টা ২৮ ও ৭টা ২৯ মিনিটে ওই চারটি ট্যাংক লরি প্রবেশ করেছে–এমন ভুয়া এন্ট্রি করা হয় এবং পরে ৭২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল গ্রহণ করা হয়েছে বলে হিসাব সম্পন্ন করা হয়। পদ্মা অয়েল কোম্পানির কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর রেজিস্ট্রারে ট্যাংক লরি চারটি প্রবেশের রেকর্ড তৈরি করা হলেও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের এডিসি মেইন গেটের প্রবেশ রেজিস্ট্রারে ওই চারটি ট্যাংক লরির কোনো তথ্য নেই। একইভাবে গেটের সিসিটিভি ফুটেজেও সেগুলোর প্রবেশের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর সিসিটিভি ফুটেজেও একই অবস্থা দেখা গেছে। অথচ ডিপোর গেট রেজিস্ট্রারে সেগুলো প্রবেশ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনার সঙ্গে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ইনচার্জ ম্যানেজার (অপারেশন্স) সাইদুল হক, চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা মো. সামির উদ্দিন, চেকার মো. আকতার কামাল (৩৪২৩), ট্যাংক ডিপার মো. ইসমাঈল (৩৫৭২), আকতার কামালের ভাতিজা ক্যাজুয়েল শ্রমিক মো. তানিম এবং ইসমাঈলের ছোট ভাই ক্যাজুয়েল শ্রমিক মো. হাসান জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলেও ওই সময় অভিযোগ উঠে।
কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপো থেকে জ্বালানি তেল পাচারের অভিযোগে এর আগেও তদন্ত হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ১৭ ফেব্রুয়ারি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তদন্তে কিছু অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলেও পরে প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনার পরই আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ১১ মার্চের এই আত্মসাতের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপো একটি সংবেদনশীল কেপিআই স্থাপনা। এখান থেকে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানের জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একের পর এক জ্বালানি তেল পাচারের অভিযোগ ওঠার পর কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে।
ঘটনা তদন্তে পদ্মা অয়েল কোম্পানির উপ–মহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) শফিউল আজমকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন, ব্যবস্থাপক (পরিচালন) পেয়ার আহমেদ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কর্মকর্তা কে এম আবদুর রহিম। কমিটিকে ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়। কমিটির সদস্যরা গত দুদিন ধরে অনুসন্ধান করে চার ট্যাংক লরিভর্তি জেট ফুয়েল গায়েব করার ঘটনা উদ্ঘাটন করছেন। কমিটি প্রায় কোটি টাকার জেট ফুয়েল গায়েব করে দেওয়ার ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পায়। ঘটনার প্রেক্ষিতে সাইদুল হককে ঢাকা বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দেয়ার পর ডিপোর ম্যানেজার সাইদুল হক, চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা সামির উদ্দিন, চেকার আকতার কামাল এবং সিকিউরিটি বিভাগের নায়েক শওকত কাজীকে সাসপেন্ড করা হয়।
দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং কোম্পানির আইন অনুসরণ করে গতকাল সাইদুল হককে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েলের দাম কোম্পানির একাউন্টে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয় এবং তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানিগুলোতে তেল চুরি ও লোপাটের ঘটনা ঘটলেও শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার নজির খুবই কম। লোপাটকৃত তেলের দাম ফেরত এবং বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর এই নজির ভবিষ্যতে তেল চোরদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেও তারা মন্তব্য করেন।
সাইদুল হককে তেলের টাকা কোম্পানির একাউন্টে জমা প্রদান এবং বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ব্যাপারে পদ্মা অয়েল কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার (এইচ আর) মীর মোহাম্মদ ফখরুদ্দীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত এবং কোম্পানির প্রবিধান মতে উপরোক্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিষয়টি চিঠির মাধ্যমে সাইদুল হককে জানানো হয়েছে। তিনি আগামী ৮ কর্মদিবসের মধ্যে এই ব্যাপারে তার কোনো বক্তব্য থাকলে প্রদান করতে পারবেন।












