নিষ্পত্তির চেয়ে নতুন মামলা বেশি

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসি । আদালত বাড়ানোর পাশাপাশি নিজস্ব ভবনেরও আরজি, অগ্রগতি নেই সাড়ে চার দশকেও

হাবীবুর রহমান | বৃহস্পতিবার , ২০ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ

যতটা মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি নতুন মামলা যোগ হচ্ছে। ফলে প্রতি বছরের শেষে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় একই রকম থেকে যাচ্ছে। এ চিত্র চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসির। এমন অবস্থায় এ ম্যাজিস্ট্রেসির আটটি আদালতে মামলার পাহাড় দিন দিন আরও বাড়ছে।

সাড়ে ৪ দশক আগে ৪টি আদালতের সমন্বয়ে তৎকালীন ৬টি থানা বিশিষ্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসির কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৭ সালে ৩টি ও ২০০৮ সালে ১টি বেড়ে আদালতের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৮টি। তখন মামলার সংখ্যা ছিল ১৫,১০৬ টি। আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, চলতি বছরের গত জুন মাসের শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসিতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ হাজার। বিপরীতে আদালতের সংখ্যা রয়ে গেছে সেই আটটিই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নগরী, বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত ৭০ লাখেরও বেশি মানুষের চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য মাত্র আটটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় বর্তমানে ১৬টি থানা রয়েছে। সে অনুযায়ী আটটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত যথেষ্ট নয়। মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়িয়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হলে আদালতের সংখ্যা বাড়াতেই হবে। আইনজীবী সমিতি ও আদালতসূত্র বলছে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসির জন্য আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি চেয়ে নানা সময় আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি এ ম্যাজিস্ট্রেসির জন্য পৃথক নিজস্ব ভবন নির্মাণের আরজিও জানানো হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেসব আরজির বিষয়ে কোনো অগ্রগতির দেখা মেলেনি।

নিষ্পত্তি অনেক হচ্ছে, কিন্তু বছর শেষে বিচারাধীন মামলা একই থেকে যায় : চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসি সূত্র জানিয়েছে২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসিতে আমলি ও বিচারিক ফাইল মিলিয়ে মোট ৬৬,৪১৭টি নতুন মামলা যুক্ত হয়েছিল। বিপরীতে একই সময়ে মোট ৩৯,৮১৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত) আদালতগুলোতে মোট ৫০,৩৯৪টি নতুন মামলা ও বিভিন্নভাবে প্রাপ্তি ঘটেছে। এর বিপরীতে এই সময়ে আদালতগুলো মোট ৩৯,২৬৮টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে। গত জুন মাসের মাসিক বিবরণী অনুযায়ীচলতি বছরের জুন মাস শেষে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসিতে বিভিন্ন স্তরে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ৬৯,৬৮৩টিতে। প্রতিটি আদালতে গড়ে আট হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন।

আদালত সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সাল শেষে এ ম্যাজিস্ট্রেসিতে বিচারাধীন মামলা ছিল ৫৯,৯৩৯টি। আর ২০২৫ সাল শেষে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা পৌঁছায় ৬৬,২৪৯টি।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসির পটভূমি ও ইতিহাস : ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে ৪ টি আদালতের সমন্বয়ে তৎকালীন ৬টি থানা বিশিষ্ট চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসির কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর ৩টি বেড়ে ৭টি হয়। তখন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১৫,১০৬টি। পরের বছর তথা ২০০৮ সালে আরো ১টি আদালতের সংখ্যা বাড়ানো হয়। সবমিলে আদালতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮টি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় চট্টগ্রাম নগরীতে থানার সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে ১৬টিতে উন্নীত হয়েছে। অথচ প্রায় সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আদালতের সংখ্যা সেই ৮টিতেই আটকে রয়েছে। ১৬টি থানার অপরাধ ও মামলার বিপরীতে এই ৮টি আদালত অপ্রতুল হওয়ায় জটের এই স্থায়ী সংকট তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় থানার সংখ্যা ১৬টি হলেও অত্র ম্যাজিস্ট্রেসিতে ১জন চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, ১জন অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬জন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে ম্যাজিস্ট্রেসির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার দ্রুত বিচার আদালত নং, ২ ও ৩এর কার্যক্রম যথাক্রমে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং, ২ ও ৩এর দায়িত্বপ্রাপ্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটরা পরিচালনা করেন এবং বিশুদ্ধ খাদ্য আইনের মামলাগুলো মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং৪ কর্তৃক পরিচালিত হয়।

আদালতের সংখ্যা বাড়াতেই হবে : আদালতের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি আদালতে গড়ে ৮ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন আছে। যার কারণে প্রতিটি মামলা ৫/৬ মাস পর পর তারিখ পড়ে। বর্তমানে বিদ্যমান বিচারক ও জনবল দিয়ে উক্ত বিপুল সংখ্যক মামলা দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এর ফলে মামলার দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিচারপ্রার্থীরা যথাসময়ে ন্যায় বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা বিচার ব্যবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এছাড়াও চট্টগ্রাম মহানগরীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে নতুন নতুন অপরাধ প্রবণতা ও মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৭ সালের তুলনায় বর্তমানে চলমান মামলার সংখ্যা চারগুণের অধিক। আদালতের সংখ্যা বাড়ানো না হলে প্রতিদিন নতুন নতুন মামলা দায়ের হয়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। এরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জরুরি ভিত্তিতে কমপক্ষে ৩টি অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের ২০টি নতুন পদ এবং আদালতের সংশ্লিষ্ট সহায়ক কর্মচারীর পদ সৃজন করা প্রয়োজন। তিনি জানান, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসিতে বিদ্যমান ৮টি আদালতের পাশাপাশি প্রশাসনিক শাখা, নেজারত শাখা, রেকর্ড রুম, ডিজিটাল মালখানাসহ পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কার্যালয় থাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীর উপচে পড়া ভিড় থাকে নতুন আদালত ভবনের দ্বিতীয় তলায়। পর্যাপ্ত জায়গা ও বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে অসহ্য গরমে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা প্রায়ই হিট স্ট্রোকসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হচ্ছেন। আদালতের আরেক কর্মকর্তা জানান, শুধু আদালতের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসির জন্য নিজস্ব একটি ভবনও নির্মাণ করতে হবে। আদালতের সংখ্যা ও সহায়ক জনবল বৃদ্ধি করা হলে বর্তমান অবকাঠামোতে ম্যাজিস্ট্রেট ও কর্মচারীদের জন্য ন্যূনতম দাপ্তরিক কক্ষ বা বসার স্থান সংকুলান করা একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়বে। এসব বিষয় উল্লেখ করে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবর পৃথক দুটি চিঠি দেওয়া হয়েছেউল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ১১ জানুয়ারি ও ১১ মে উক্ত চিঠিগুলো দেওয়া হয়। এর আগেও নানা সময়ে এমন চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, মানুষ বেশি, কিন্তু আদালত কম। সবসময় ভিড় লেগেই থাকে। দাঁড়ানোর জায়গাটা পর্যন্ত পাওয়া যায় না। নারীদের বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন, নিষ্পত্তি ভালই হচ্ছে, কিন্তু নতুন মামলাও তো যোগ হচ্ছে। সে অনুযায়ী বছর শেষে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রতি বছর প্রায় একই থেকে যাচ্ছে। আদালতের সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে বিষয়টি আইনমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের নজরে দেওয়া হয়েছে। সবসময় আমরা সেটি করে যাচ্ছি। কিন্তু আদালতের সংখ্যা থেকে গেছে সেই একই। দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন আদালত ও বিচারক বৃদ্ধি এবং স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণ করা না হলে বিচার ব্যবস্থার এই দীর্ঘসূত্রতা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউপকূলীয় বাঁধ সংস্কারে ৫৫৮ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে অনুমোদন
পরবর্তী নিবন্ধ‘শানকে তার প্রাপ্ত নম্বর আর কখনও জানানো হবে না’