নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে জাপানের বিনিয়োগ পরিকল্পনা

| শুক্রবার , ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি দুটি প্রকল্পে প্রায় ২৯৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। স্বাক্ষরিত দলিলগুলোতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কৃষি, কর্মসংস্থান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, দলিলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদারে একটি টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ ২.১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (১৩.৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অনুদান চুক্তি রয়েছে। এ ছাড়া, জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নবিষয়ক একটি সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরিত হয়েছে।

জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কর্মসূচি (এমপ্লয়মেন্ট ফর স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম–ইএসডিপি) বিষয়েও একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সহযোগিতা জোরদারে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি আগ্রহপত্র (লেটার অব ইনটেন্ট–এলওআই) স্বাক্ষরিত হয়েছে। অন্যদিকে, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নবিষয়ক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ১৫.৮৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (১০০.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। এ ছাড়া, উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে ৩০.৬৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (১৯৪.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। দুটি প্রকল্পে ঋণের মোট পরিমাণ ৪৬.৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন, যা প্রায় ২৯৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের সবচেয়ে আলোচিত ঘোষণা হলো, আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে সর্বোচ্চ এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারে। এতে প্রায় দুই লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। তবে বিনিয়োগের পরিমাণ ও কর্মসংস্থান নির্ভর করবে কম্পানিগুলোর প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়নের ওপর। সফরে দুই দেশ কয়েকটি সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং পরিবেশ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি দ্রুত কার্যকর হলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সমপ্রসারণ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ বেশ কিছু বাণিজ্য সুবিধা হারাবে। বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি কার্যকর হলে জাপানের বাজারে রপ্তানির সুযোগ বাড়বে এবং পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা মিলবে। তবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাপানি কম্পানির যোগসূত্র, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিনিয়োগ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশকে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে। নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ ও দ্রুত অনুমোদন, চুক্তির নিশ্চয়তা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, উন্নত বন্দর–পরিবহন এবং দক্ষ কর্মী–এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি দরকার। জমি ও অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলে বিনিয়োগকারীদের প্রকল্প শুরু করা সহজ হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার ও পরিবেশগত মান বজায় রাখতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে জাপানের বিনিয়োগ পরিকল্পনা। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফর ঘিরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাঁরা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য জাপান ও চীন গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে চীন, ভারত ও জাপানের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণ বিবেচনায় রেখেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু অর্থায়ন নিশ্চিত করলেই চলবে না, এর অর্থনৈতিক সুফলও নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁরা বলেন, দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে জাপানি বিনিয়োগ প্রয়োজন। অটোমোবাইল, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্প উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব বিনিয়োগে উৎপাদিত পণ্যকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে কিংবা বিদেশে–যেখানেই বিক্রি হোক, পণ্যটি বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য হিসাবে পরিচিতি পাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধফজলে লোহানী : সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব