নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার জন্য উদ্যোগ জরুরি

| রবিবার , ১ নভেম্বর, ২০২৬ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২২–এর একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে কর্মজীবীদের ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ বা ছয় কোটি মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় কর্মক্ষম মানুষ বাধ্য হয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে শ্রম দিচ্ছেন। শ্রমের বিনিময়ে তারা কেউ ধনী হয়েছেন এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই, কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে তারা নিমগ্ন। শহরাঞ্চলের অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মজীবীদের একটি বিশাল অংশ বস্তিতে অমানবিক জীবনযাপন করেন। আরেকটি অংশ ফুটপাত, রেলস্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ড বা মার্কেটের বারান্দায় ভ্রাম্যমাণ জীবনযাপন করেন। তিনবেলা খাবার জোগানোই তাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। নগরমুখী অভিবাসীর এ বিশাল জনগোষ্ঠী পরিবেশ দূষণ, যানজট, পানি ও বিদ্যুতের ওপর চাপসহ নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। অর্থনীতিকে বিকেন্দ্রীকরণ না করে ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের কুফল নগরবাসীকে এখন ভোগ করতে হচ্ছে। এদিকে পরিকল্পনার অভাব, দারিদ্র্য, অদক্ষতা, পশ্চাদপদ শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে দেশের বেকার সমস্যা বাড়ছে। বেকারত্ব সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করেছে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায় ২০২৪ সালে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় নয় লাখ। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে উচ্চশিক্ষিত বেকাররাই সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামীর বাংলাদেশে বেকারত্ব সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। এরই মধ্যে বেকারত্বের প্রভাব প্রকট হয়ে উঠতে শুরু করেছে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের অভাবে ছোট–বড় সব শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালা ও মোটরবাইক রাইডারদের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে।

তবে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং, রাইডশেয়ারিং, খাবার ও পণ্য সরবরাহ, অনলাইন কনটেন্ট তৈরি কিংবা অ্যাপভিত্তিক বিভিন্ন কাজে যুক্ত হচ্ছেন। একসময় বাড়তি আয়ের মাধ্যম হিসেবে এসব কাজকে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এটিই বর্তমানে অনেকের জীবিকার প্রধান উৎস, যাকে বলা হচ্ছে গিগ জব বা গিগ ইকোনমি (অর্থনীতি)। তবে কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী গিগ অর্থনীতির আকার বাড়ছে। কিন্তু এ দেশে গিগ অর্থনীতির বিকাশের প্রেক্ষাপটটি অন্তত বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ভিন্ন। শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব এবং উপযুক্ত চাকরি পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার বাস্তবতায় গিগ ইকোনমি তথা গিগ অর্থনীতির সমপ্রসারণ ঘটছে দেশে। গত এক দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে ৮৭ লাখের। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে গিগ অর্থনীতি বেকার ও কর্মপ্রত্যাশী তরুণদের আয়ের বিকল্প পথ তৈরি করছে। এ দিক থেকে বিষয়টি ইতিবাচক। তবে বাস্তবতা হলো, এ খাতের সমপ্রসারণকে দেশের কর্মসংস্থান সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমত কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার মানের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। যে শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি দিচ্ছে, তা কর্মবাজারের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ স্নাতক হয়েও এমন দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না, যা দিয়ে তাঁরা চাকরি পেতে পারেন। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের দিক থেকে অঞ্চলভেদে ব্যাপক বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। তাঁরা বলেন, আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর উপায় হচ্ছে যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থান বাড়ানো। আর এ জন্য প্রয়োজন নতুন বিনিয়োগ। বিনিয়োগের মাধ্যমে যেমন ব্যবসা ও শিল্প গড়ে ওঠে, তেমনি কাজের সুযোগও তৈরি হয়। তাতে মানুষের ভোগ বাড়ে, গতি আসে অর্থনীতিতে। তাই আগামীতে কর্মসংস্থান তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তাঁরা বলেন, বেকারত্ব দূর করতে হলে অবশ্যই নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। সেজন্য বিনিয়োগের আরও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজন, জ্বালানি সংকট দূর করা ও অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। বিশেষত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এই দুটি ক্ষেত্রের উন্নতি সাধনের বিকল্প নেই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে