মাত্র ৮ দিনের ভারী বর্ষণে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে নগরের ১৯৬ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার সড়ক। যা গত ছয় বর্ষার পুরো মৌসুমের ক্ষয়ক্ষতিকে ছাড়িয়ে গেছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রাথমিক হিসাবে, এবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সড়ক সংস্কারে প্রয়োজন ৩৪৭ কোটি ৮২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অথচ, চলতি ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরে আপৎকালীন সড়ক মেরামতের (প্যাচওয়ার্ক) জন্য সংস্থাটির বরাদ্দ আছে মাত্র ২২ কোটি টাকা। এ অবস্থায় আর্থিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার করা চসিকের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, এ বছর টানা বৃষ্টি হয়েছে। আবার, একদিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, তা গত ৪২ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। টানা বর্ষণে প্রচুর সড়ক নষ্ট হয়েছে। আর্থিকভাবে কর্পোরেশন দুর্বল। এরপরও রাজস্ব খাত থেকে আমরা প্যাচওয়ার্কের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার শুরু করব। কিছু প্রকল্পের মাধ্যমে করা হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সড়ক নষ্ট হয়েছে, এখানে আমাদের কিছু করার ছিল না। এক্ষেত্রে আমরা মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ চাইব।
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল আজাদীকে বলেন, এখন আমাদের প্রথম কাজ হবে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সচল রাখা। যেসব জায়গায় গর্ত হয়েছে সেখানে ইট দিয়ে ভরাট করে দেব। রাস্তা একটু শুকালে প্যাচওর্য়াক করে দেব। যেখানে চলমান কাজের ঠিকাদার আছেন, সেখানে তাদের সম্পৃক্ত করব। এবাবে গুচ্ছ গুচ্ছ উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার করে যান চলাচল উপযোগী করা হবে।
এদিকে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, নগরের বেশিরভাগ সড়কের বিভিন্ন জায়গায় বিটুমিন, ইট, বালু ওঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ছোট–বড় গর্ত। এতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। চসিকের প্রকৌশলীরা বলছেন, বিটুমিন দিয়ে নির্মিত সড়ক নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ পানি। বিটুমিনের শত্রু পানি। কোনো কারণে সড়কে পানি জমে থাকলে এবং এর ওপর দিয়ে ভারী গাড়ি চলাচল করলে সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
জোনভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতি : গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হয় বর্ষণ। এরপর ৬ জুলাই খেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত একটানা ভারী বৃষ্টি হয়। এছাড়া পরবর্তী দুই দিন ১১ ও ১২ জুলাই এ বর্ষণ অব্যাহত ছিল। সবমিলিয়ে টানা প্রায় ৮ দিন বৃষ্টি হয় নগরে। এতে ক্ষতবিক্ষত হয় নগরের সড়ক।
চসিকের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটি প্রতিবছর বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের তালিকা করে। এবার বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত তালিকাটি চূড়ান্ত করা হয় গতকাল সোমবার। এর আগে দুই দিন চসিকের প্রকৌশলীরা মাঠ পর্যায়ে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করেন। এবার পুরো শহরকে ৬টি অঞ্চলে ভাগ করে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
প্রস্তুতকৃত এ তালিকা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৬৭ দশমিক ৮২ কিলোমিটার সড়ক নষ্ট হয়েছে ৪ নম্বর জোনে। এ জোনে রয়েছে ২৩ নং উত্তর পাঠানটুলী, ২৪ নং উত্তর আগ্রাবাদ, ২৭ নং দক্ষিণ আগ্রাবাদ, ২৮ নং পাঠানটুলী, ২৯ নং পশ্চিম মাদারবাড়ী, ৩০ নং পূর্ব মাদারবাড়ী ও ৩৬ নং গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ড।
ক্ষয়–ক্ষতির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ১ নম্বর জোন। এ জোনে ২৮ দশমিক ৬২ কিলোমিটার সড়ক নষ্ট হয়েছে। এ জোনভুক্ত ওয়ার্ডগুলো হচ্ছে দক্ষিণ পাহাড়তলী, জালালাবাদ, পাঁচলাইশ, পশ্চিম ষোলশহর ও শুলকবহর ওয়ার্ড। এছাড়া ৬ নম্বর জোনে ২৬ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার, ২ নম্বর জোনে ২৬ কিলোমিটার, ৩ নম্বর জোনে ২৪ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার ও ৫ নম্বর জোনে ২৩ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে।
ক্ষতি বেশি উত্তর আগ্রাবাদে : সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ২৪ নং উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে। এছাড়া ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ও ২৭ নম্বর দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে সড়ক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে উত্তর আগগ্রাবাদ ওয়ার্ডের ৩১টি সড়ক নষ্ট হয়েছে, যার দৈর্ঘ্য ৩৭ দশমিক ৫০ কিলোমিটার। এসব সড়ক সংস্কারে প্রয়োজন ৪৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। দক্ষিণ আগ্রাবাদের ১০ দশমিক ৬১ কিলোমিটার দীর্ঘ ২৪টি ও দক্ষিণ কাট্টলীর ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ২৭টি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আগ্রাবাদ এঙেস রোড, এল ব্লক ও কে ব্লক আবাসিক এলাকা রোড, আনন্দিপুর রোড বাই লেইন, গোল্ডেন আবাসিক এলাকা রোড ও বাইলেইন, বসুন্ধরা গোল্ডেন আবাসিক এলাকা রোড ও বাইলেইন, আগ্রাবাদ হাউজিং আবাসিক এলাকা রোড ও বাইলেইন, শ্যামলী আবাসিক এলাকা রোড ও বাইলেইন, রহমানবাগ আবাসিক এলাকা রোড ও বাইলেইন, গুলবাগ আবাসিক এলাকা রোড ও বাইলেইন, উত্তরা আবাসিক এলাকা রোড ও বাইলেইন, হাজী পাড়া রোড ও বাইলেইন, দাইয়া পাড়া রোড ও বাইলেইন, মৌলভী পাড়া রোড ও বাইলেইন, শেখ মুজিব রোড ও বাইলেইন, হালিশহর রোড ও বাইলেইন, পানওয়ালা পাড়া রোড ও বাইলেইন, মিস্ত্রি পাড়া রোড ও বাইলেইন, মুহুরী পাড়া রোড ও বাইলেইন, রঙ্গী পাড়া রোড ও বাইলেইন, মোল্লা পাড়া রোড ও বাইলেইন, হাজার দিঘীর পাড় রোড ও বাইলেইন, ব্যাংক কলোনি রোড ও বাইলেইন, রমনা আবাসিক এলাকা রোড ও বাইলেইন, টেঙিন ফকির মাজার রোড ও বাইলেইন, ইমাম বাড়ি রোড ও বাইলেইন, আসকারাবাদ রোড ও বাইলেইন, মনসুরাবাদ রোড ও বাইলেইন, মিয়াবাড়ী রোড ও বাইলেইন, শান্তিবাগ আবাসিক এলাকা রোড ও বাইলেইন, সবুজবাগ আবাসিক এলাকা রোড ও বাইলেইন, চাড়িয়া পাড়া রোড ও বাইলেইন।
ছয় বছরে সর্বোচ্চ ক্ষতি : অতীতের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত বছর (২০২৫) ভারী বর্ষণে নগরের ৪১ ওয়ার্ডে ১৪২ দশমিক ২৮১ কিলেমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আগে ২০২৪ সালে ৪২ কিলোমিটার, ২০২৩ সালে ৫০ দশমিক ৭১ কিলোমিটার, ২০২২ সালে প্রায় ১০০ কিলোমিটার, ২০২১ সালে ৩৬ দশমিক ২৭ কিলোমিটার ও ২০২০ সালে ১৭০ কিলোমিটার রাস্তা বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবশ্য, ২০১৭ সালে বর্ষায় ৩০০ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছিল।
প্যাচওয়ার্কের বরাদ্দ মাত্র ২২ কোটি টাকা : চসিক নিজস্ব অ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট থেকে তৈরি মিঙার (ইট, বালু, সিমেন্টে, বিটুমিনের মিশ্রণ) দিয়ে বর্ষায় ক্ষতি হওয়া সড়কের ছোট ছোট গর্ত ভরাট করে থাকে। সংস্থাটির ভাষায়, এটি প্যাচওয়ার্ক। চলতি ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরে প্যাচওয়ার্কের মালামাল ক্রয়ে বরাদ্দ রাখা আছে মাত্র ২২ কোটি টাকা।
এর আগে, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও খরচ করে ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে প্যাচওয়ার্কের মালামাল ক্রয়ে ২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও ব্যয় হয় ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০২৩–২০২৪ অর্থবছরে ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখলেও খরচ হয় ১৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
চসিকের ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, নগরে ৩ হাজার ৪৫৯টি সড়ক আছে, যার মোট দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৪২ দশমিক ৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে অ্যাসফল্ট সড়ক আছে ১ হাজার ৭৫০টি, যার দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৬ কিলোমিটার। এছাড়া ৩৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ১ হাজার ৪২৭টি কংক্রিট সড়ক, ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৪১টি ব্রিক সলিং সড়ক ও ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৪১টি কাঁচা সড়ক রয়েছে।











