সোহেল হাসান গালিব এর ‘‘জলের জার্নাল, ধুলায় বল্কলে’’ কবিতাটি শুধু একটি রাজনৈতিক কবিতা নয়; এটি সময়, রাষ্ট্র, ক্ষমতা, ইতিহাস, বিপ্লব, মানবিক আকাঙক্ষা এবং সেই আকাঙক্ষার বিশ্বাসঘাতকতার এক বহুমাত্রিক কাব্য–নথি। কবি সোহেল হাসান গালিব এখানে প্রতীকের পর প্রতীক, পুরাণের পর পুরাণ, ইতিহাসের পর ইতিহাস সাজিয়ে এমন এক কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন, যা পাঠককে শুধু অনুভূতির নয়, চিন্তারও গভীর অঞ্চলে নিয়ে যায়।
বাংলা কবিতায় এমন কিছু কবিতা আছে, যেগুলো কেবল পড়া যায় না–বারবার ফিরে যেতে হয়। কারণ তাদের প্রতিটি স্তবক নতুন অর্থের দরজা খুলে দেয়। সোহেল হাসান গালিবের “জলের জার্নাল, ধুলায় বল্কলে” তেমনই একটি দীর্ঘ কবিতা। এটি কোনো একক ঘটনার বিবরণ নয়; বরং একটি জাতির রাজনৈতিক যাত্রাপথ, বিপ্লবের উত্তাপ, ক্ষমতার রূপান্তর, সামাজিক অবক্ষয় এবং ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তির এক কাব্যিক দলিল।
কবিতাটি শুরুই হয় এক গভীর অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন দিয়ে–
“এ ধূসর দিন কিংবা ঊষর এ রাত্রি
কবে ছিল কার সহযাত্রী!”
এই প্রশ্ন কেবল সময়কে উদ্দেশ করে নয়; এটি আমাদের সমষ্টিগত স্মৃতির প্রতিও নিক্ষিপ্ত। ধূসর দিন ও ঊষর রাত্রি এখানে কেবল প্রকৃতির অবস্থা নয়; এগুলো ইতিহাসের ক্লান্তি, রাষ্ট্রের নৈতিক অবক্ষয় এবং মানুষের ভেঙে পড়া বিশ্বাসের প্রতীক। কবি জানতে চান–এই নিরানন্দ সময় কি সত্যিই আমাদের চিরসঙ্গী ছিল, নাকি আমরা নিজেরাই এমন এক সময় নির্মাণ করেছি?
কবিতার প্রথমাংশে প্রকৃতির চিত্রও যেন মানুষের মতো আহত। মেহগনি, মহানিম, কড়ই, ছাতিম, কৃষ্ণচূড়া–সব গাছ যেন সাক্ষ্য দিতে অক্ষম। এমনকি
“দুপুরের ছ্যাঁকা–খাওয়া ব্যথিত বল্কলে।”
এই একটি চিত্রকল্পেই কবি অসাধারণ দক্ষতায় প্রকৃতিকে মানবিক যন্ত্রণার শরিক করেছেন। বল্কল বা বৃক্ষের বাকলও যেন দগ্ধ, ক্ষতবিক্ষত। প্রকৃতি এখানে নীরব সাক্ষী; কিন্তু সেই সাক্ষীও আজ আঘাতে বাকরুদ্ধ।
কবিতার দ্বিতীয় পর্বে হঠাৎ দৃশ্যপট বদলে যায়। ধূসরতা ভেঙে দেখা দেয় গণজাগরণের এক বিস্ময়কর চিত্র।
“রাজাদের দম্ভ আর রানিদের শ্লেষ
চূর্ণ করতে এসেছিল উদ্ভিন্ন সারা দেশ।”
এখানে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের উল্লেখ নেই। ফলে কবিতাটি একাধিক রাজনৈতিক মুহূর্তের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। শাসকের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত অভ্যুত্থান ইতিহাসে বারবার ঘটেছে; কবি সেই চিরন্তন জনজাগরণের রূপটিকেই ধরেছেন।
এই বিপ্লবে নারী–পুরুষের পাশাপাশি উপস্থিত গন্ধর্ব, কিন্নর, লিঙ্গহারা, এমনকি প্রেতাত্মাও। অর্থাৎ কবির বিপ্লব সর্বজনীন; এখানে প্রান্তিক মানুষেরও সমান অংশগ্রহণ আছে। আরও লক্ষণীয়, কবি বিপ্লবকে একমাত্র রাজনৈতিক মিছিলে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি লিখেছেন–
“এসেছিল এ ধরার সরাখানা উল্টাতে।“
এই পঙ্ক্তি বিপ্লবকে অস্তিত্বগত রূপ দেয়। কেবল সরকার বদল নয়; সমাজব্যবস্থা, মূল্যবোধ, ক্ষমতার কাঠামো–সব উল্টে দেওয়ার আকাঙক্ষাই এখানে মুখ্য।
এই কবিতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর বহুসাংস্কৃতিক ও বহুমাত্রিক রেফারেন্স।
ব্যাবেল, কেনান, সিনাই, জর্ডান নদী, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা–একই কবিতায় বাইবেলীয় ভূগোল এবং বাংলাদেশের নদী পাশাপাশি এসেছে। এ যেন মানবসভ্যতার দীর্ঘ মুক্তিযাত্রাকে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার এক কাব্যিক কৌশল। ব্যাবেল থেকে কেনানের যাত্রা যেমন প্রতিশ্রুত ভূমির সন্ধান, তেমনি বাংলাদেশের মানুষেরও ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন। কিন্তু সেই যাত্রা কি সত্যিই গন্তব্যে পৌঁছেছে? এই প্রশ্নই কবিতার অন্তঃস্রোত। ক্ষমতার চিরন্তন প্রলোভন কবিতার সবচেয়ে তীক্ষ্ন রাজনৈতিক উপলব্ধি সম্ভবত এই অংশে–
“তাদেরও অন্তিম ইচ্ছা
অতি সনাতন ওই গদিতে বসারই।”
এই কয়েকটি পঙ্ক্তি পুরো কবিতার দর্শনকে সংক্ষেপে ধারণ করে। বিপ্লবীরা ক্ষমতাকে উৎখাত করতে আসে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাও ক্ষমতার মোহে বন্দী হয়। ডান, বাম কিংবা মধ্যপন্থা–কেউ এই প্রলোভন থেকে মুক্ত নয়। এই উপলব্ধি কবিকে কেবল প্রতিবাদী কবি নয়; গভীর রাজনৈতিক দার্শনিকের মর্যাদা দেয়। মহাভারতের জয়দ্রথ ও দ্রৌপদীর প্রসঙ্গ এনে কবি সমকালীন নারী–নিপীড়নের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় অবস্থান নিয়েছেন।
“এ কেমন জয় হে তোমার, জয়দ্রথ!”
এই প্রশ্ন কেবল পুরাণের চরিত্রকে নয়; সমকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজকেও উদ্দেশ করে। এরপর কবির আরও নির্মম উচ্চারণ–
“কেবলই শিশ্নের অভ্যুত্থান!”
এখানে যৌনতা নয়, ক্ষমতার বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক রূপের বিরুদ্ধে কবির ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে। নারীকে দখল করার মানসিকতাকেই তিনি সভ্যতার পতনের লক্ষণ হিসেবে দেখেছেন। কবিতার পরবর্তী অংশে রাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিও প্রবলভাবে উপস্থিত। বন্দর বিক্রি, বৈদেশিক চুক্তি, করিডোর, ভারত–আমেরিকা–চীন–বার্মা–এসব প্রসঙ্গ দেখায় কবির রাজনৈতিক দৃষ্টি কেবল অভ্যন্তরীণ নয়; বৈশ্বিক।
তিনি প্রশ্ন করেন–
ক্ষমতা কি জনগণের জন্য, নাকি বহুজাতিক স্বার্থের জন্য?
রাষ্ট্র কি স্বাধীন, নাকি ক্রমশ নতুন ধরনের নির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কবি দেন না; পাঠকের বিবেকের উপর ছেড়ে দেন।
কবিতার আরেকটি অংশে কবি ইতিহাসের ভূমিকাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন।
“ইতিহাস লিখতে এসে, দ্যাখো, ইতিহাসই
লিখছে তোমাকে।”
এটি সম্ভবত সমগ্র কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী পঙ্ক্তিগুলোর একটি। মানুষ ভাবে সে ইতিহাস লিখছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাসই মানুষের বিচার করে। ক্ষমতা, খ্যাতি, বিজয়–সবই ক্ষণস্থায়ী। অবশেষে মানুষ পরিণত হয়–
“মার্জিনে মন্তব্য কারো, এক বিন্দু ফুটনোট।”
এই চিত্রকল্প অসাধারণ। একটি বিশাল ইতিহাসের বইয়ে আমরা হয়তো মূল পাঠ নই; কেবল ফুটনোট।
ভাষা ও শিল্পরীতি:
এই কবিতার ভাষা ঘন, প্রতীকসমৃদ্ধ এবং বহুস্তরবিশিষ্ট। এখানে লোকজ শব্দ, রাজনৈতিক পরিভাষা, পুরাণ, ধর্মগ্রন্থ, বিশ্বসভ্যতা, নগরজীবন, বিজ্ঞাপন, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক–সব একই বয়ানে মিশেছে।
কখনও ভাষা গীতল–
“ঘাম–ঝরা দিন, হাম–ধরা রাত্রি…”
আবার কখনও তা ব্যঙ্গাত্মক, কখনও মহাকাব্যিক, কখনও নির্মম রাজনৈতিক। কবির শব্দচয়নে যেমন দেশীয়তা আছে, তেমনি বিশ্বসাহিত্যের অনুষঙ্গও প্রবল। ফলে কবিতাটি একদিকে স্থানীয়, অন্যদিকে বিশ্বজনীন।
“জলের জার্নাল, ধুলায় বল্কলে” এমন একটি কবিতা, যা সমকালকে ধারণ করলেও কেবল সমকালেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিপ্লবের উল্লাস যেমন লিপিবদ্ধ করে, তেমনি বিপ্লব–পরবর্তী হতাশাও। এটি ক্ষমতার নির্মম চক্রকে উন্মোচন করে, আবার মানুষের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাকেও অস্বীকার করে না। কবিতার আরেকটি অংশ তাই পুরো রচনার সারাংশ হয়ে ওঠে–
“আমরা কি ছিলাম তবু হায়
কোনো একদিন–আমাদেরই সহযাত্রী?”
এই প্রশ্নের উত্তর কবি দেন না। কারণ সেই উত্তর ইতিহাসের নয়, পাঠকের। ধূসর দিন ও ঊষর রাত্রির ভেতর দাঁড়িয়ে প্রত্যেক প্রজন্মকে নিজের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতে হয়।
এই কবিতা সোহেল হাসান গালিবের কাব্যভাষার পরিণত শক্তির পরিচায়ক। প্রতীকের নিবিড় ব্যবহার, ইতিহাস ও পুরাণের সৃজনশীল পুনর্নির্মাণ, রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি এবং ভাষার ঘনত্ব–সব মিলিয়ে এটি সমকালীন বাংলা কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘ কবিতা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। এর পাঠ সহজ নয়; কিন্তু একবার পাঠক এর প্রতীকী জগতে প্রবেশ করতে পারলে বুঝতে পারেন, এটি কেবল একটি কবিতা নয়–এটি আমাদের সময়ের আত্মসমালোচনার এক কাব্যময় আয়না।












