অর্থনীতিবিদরা বলেন, বিনিয়োগকারীরা কোনো সময়ই সারা পৃথিবীতেই কোনো জায়গায় বিনিয়োগ করতে চাইবে না যদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকে। বিনিয়োগের মাধ্যমেই তো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে ইতোপূর্বে পরিচালিত সিপিডির জরিপে ১৭টি সমস্যা সামনে এসেছে, এর মধ্যে দুর্নীতি এক নম্বর। ব্যবসায়ীরা বলতে পারছিলেন না সরাসরি কারণ। তাই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। তাঁরা বলেন, সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কীভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা যায়, সেই ব্যবস্থা করা। দেশি–বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে কাজে লাগাতে হবে।
গত ১ মে দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত ‘চট্টগ্রামে দেশি বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে দেশি বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। অবকাঠামোগত সমস্যা ছাড়াও বিদ্যুৎ–গ্যাসের সংকট, আন্তর্জাতিক যোগাযোগসহ নানামুখী চ্যালেঞ্জের কবলে চট্টগ্রামের বিনিয়োগ। বন্দরকেন্দ্রিক কিছু বিনিয়োগের আশ্বাস থাকলেও শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বিনিয়োগ বহুলাংশে কমে গেছে। অর্থবছর শেষ না হলেও ধারণা করা হচ্ছে যে, গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে বিনিয়োগ কম হবে। অবশ্য, গতবছরও আগের বছরের চেয়ে বিনিয়োগ ৩০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের বিশেষ পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, বিনিয়োগের তীর্থক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত চট্টগ্রামের বিনিয়োগ গত কয়েকবছর ধরে খরা চলছে। দেশি বিদেশি বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ ঘটছে না। পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালে কিছু বিনিয়োগ হয়েছে। বন্দরকেন্দ্রিক বড় কিছু বিনিয়োগের আশ্বাস পাওয়া গেলেও মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হয়নি। বে টার্মিনাল, লালদিয়ার চর টার্মিনালসহ বন্দরের একাধিক অবকাঠামোতে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে না। উল্টো বহু গার্মেন্টসসহ শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। চট্টগ্রামের বড় বড় শিল্পগ্রুপের অনেকগুলোই ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছে, বন্ধ হয়ে গেছে। মীরসরাই ইকোনমিক জোনে চীন ও সিংগাপুরের ৪টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। তবে টানেলকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে বিনিয়োগের যে জয়যাত্রা শুরু হওয়ার আশা করা হয়েছিল তার ছিঁটেফোটাও হয়নি। চট্টগ্রাম ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেডে নতুন শিল্প কারখানা গড়ে তোলার মতো কোনো জায়গাই নেই। চট্টগ্রামের বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিশ্বমানের একটি বন্দরে পরিণত করতে না পারলে বিনিয়োগ ব্যাহত হবে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের সাথে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাথে পূর্বমুখী দেশগুলোর সরাসরি বিমান যোগাযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে সরাসরি বিমান চলাচল করলেও ওইসব দেশ থেকে খুব বেশি বিনিয়োগ আসেনি। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চীন, কোরিয়া, জাপানসহ পূর্বমুখী বিনিয়োগ ঘটেছে। ওইসব দেশ থেকে আরো বিনিয়োগ আনার সুযোগ থাকলেও তা ব্যাহত হচ্ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো বিদেশি বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে একটি দেশ রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। দেশের বাইরের কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানি যখন আমাদের দেশে অর্থ বিনিয়োগ করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে, তখন আমাদের দেশের অর্থনীতি আরও সচল হয়ে ওঠে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন হয়, বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশীয় কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিতেও সহায়তা করে থাকে। এতে অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন খাতের অবকাঠামো উন্নয়নেও বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজে ও দ্রুত সময়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন তার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। তারা যাতে ব্যবসায়িক লভ্যাংশ সহজ প্রক্রিয়ায় নিয়ে যেতে পারেন তার জন্য ডিজিটাল সেবা চালু রাখতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। তাদের বিনিয়োগ করা কোনো প্রতিষ্ঠানে সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলে তা দ্রুততার সঙ্গে সমাধানের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।









