আমরা সবাই আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে খুব ভালোবাসি এই দেশের একজন নাগরিক হিসাবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এ দেশ আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব। এ স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করে আমরা ধন্য।
এ সময়ে মনে প্রশ্ন জাগে, আসলে কি আমরা স্বাধীন? স্বাধীনতার মূল্য কি আমরা বুঝি? সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ কি আমরা পেয়েছি? স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পর আমাদের স্বাধীনতার মূল্য খুঁজতে হয়। সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা বাছাই করতে হয়। দেশবিরোধী চক্রান্ত এখনো চলমান।
আজ মানুষের মনুষ্যত্ব, মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। সবার মনের মধ্যে একরাশ হতাশা। প্রশ্ন জাগে, আমরা কোন সমাজে কোন দেশে বসবাস করছি। মানুষের মধ্যে বাড়ছে লোভ লালসা, মোহ, হিংসা, ক্রোধ ও সহিংসতা আর কমছে সহিষ্ণুতা, ধৈর্য্য, মানবিকতা ও দেশপ্রেম। দেশের অভ্যন্তরে দিনে দিনে বাড়ছে চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, মারামারি, মব আর ধর্ষণের মতো লোমহর্ষক ঘটনা।
দেখা যায়, শিক্ষক ছাত্রীকে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি করছে। ভাই বোনকে, বাবা মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনাও শোনা যায়। শিশুরা প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। মানুষের আজ মানবিকতা বলতে কিছুই নেই। মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে, মনুষ্যত্বহীন হয়ে পড়ছে মানুষ।
পত্রিকার পাতা উল্টালেই দেখা যায়, মন খারাপ করার মতো সব ঘটনা। বন্ধু বন্ধুকে খুন, ভাই ভাইকে খুন, স্বামী স্ত্রীকে অথবা স্ত্রী স্বামীকে, বাবা সন্তানকে, সন্তান বাবাকে অথবা মাকে। কখনো মা তার সন্তানকে খুন করতেও দ্বিধা করে না কিম্বা সন্তান তার বাবা মাকে খুন করতেও দ্বিধা করে না। মানুষের মধ্যে স্নেহ, মায়া মমতা, আদর, ভালোবাসা হারিয়ে গিয়ে মানুষ হয়ে উঠছে নির্মম, পাশবিক আর হারিয়ে ফেলছে মানবিকতা বোধ। হিংসা, লোভ, ক্রোধ আর স্বার্থের নেশায় অন্ধ মানুষ। সুন্দর আর সূস্থ পরিবেশে বসবাসের পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকুলে নেই। চরম নিরাপত্তাহীনতায় বসবাস করছে মানুষ। আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে বহুগুণ। পরিবারে, সমাজে বাড়ছে অস্থিরতা। এর প্রভাব পড়ছে পুরো দেশে।
পরিস্থিতি বদলাতে আমাদের সবাইকে বদলাতে হবে। লোভ, দ্বেষ, মোহ ত্যাগ করতে হবে, হতে হবে মানবিক গুনসম্পন্ন মানুষ। দেশপ্রেমে হতে হবে উদ্বুদ্ধ। কেন এমন হচ্ছে, এ প্রশ্ন আজ সবার মনে। আমরা কোথায় যাচ্ছি। তলিয়ে যাচ্ছি কি?
অশান্তিতে দিন কাটছে সবার। মোবাইল আসক্তি, ডিজিটেলাইজেশানের যুগে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের উপর পড়ছে এর প্রভাব। তারা হয়ে যাচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক, আচার আচরণে উগ্রতার ছোঁয়া। অবিভাবকদের উপদেশ শোনার আগ্রহ যাচ্ছে কমে। রুমের দরজা বন্ধ করে অনলাইনে পড়াশোনার ব্যস্ততার কথা বলে। সত্যি কি তাই? পরিবারে শান্তি নেই বললেই চলে। কিশোর গ্যাং এর দৌরাত্ম্য বেড়েছে অনেকাংশে। নেশা জাতীয় পণ্য, মাদকদ্রব্য এখন তাদের হাতের নাগালে। মাদকের ব্যবসা জমজমাট। গ্রাস করছে পুরো বাংলাদেশকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা তেমন কাজে আসছে না।
ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে দেশ। দেশের মানুষ শান্তিতে নেই। বাড়ছে ঘটনা, বাড়ছে দুর্ঘটনা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার নিশ্চিন্তে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা নেই। পরিবারের কেউ কখন কোথায় কোন অঘটনের শিকারে পরিণত হয়, কেউ বলতে পারে না। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো বলা যায় না।
ব্যবহার হচ্ছে প্রচুর দেশী বিদেশী মরণঘাতী অস্ত্র। জুলাই পরবর্তী ঘটনার পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দিনযাপন করছে মানুষ।
যে কোনো উপায়ে হতে চায় বিত্তবান, পরিশ্রম না করেই টাকা রোজগার করার প্রবণতা দেশকে নিয়ে যাচ্ছে ধংসের দ্বারপ্রান্তে। দেশপ্রেম, দেশাত্মবোধ বলতে কিছুই নেই। যার প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে।
পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে কোন অগ্রগতি নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের নামেও দেশের সম্পদ অপচয় ও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। শেষমূহূর্তে তাদের করে যাওয়া অসম বাণিজ্য চুক্তির কারণে বর্তমানে দেশের জিডিপি কমে গেছে, ভোগ্যপণ্য ও নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম উর্ধ্বমুখী। ক্রয়ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। দেশের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। মানুষের মধ্যে সততার বড় অভাব।
প্রবাসীরাও শান্তিতে নেই, স্বস্তিতে নেই। রেমিটেন্স যোদ্ধারাও আছে নানান চাপের মাঝে। মধ্যপ্রাচ্যের সামপ্রতিক ঘটনার প্রভাব প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। মুদ্রার তহবিল এখন নিচের দিকে। সরকার দেশ পরিচালনার জন্য দেশীয় ব্যাংক থেকে প্রচুর পরিমাণে লোন নিচ্ছে, খোলাবাজার থেকে ডলার কিনছে। সরকার কীভাবে সামাল দিবে এ অবস্থা? এ ভাবনা এখন জনমানুষের।
এ দেশ আমাদের। যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছে এ দেশের বাঙালি মুক্তিকামী মানুষ ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা। বিশ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও দুই লাখ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া এ দেশের স্বাধীনতা, মান সম্মান ধরে রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের। স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে, তাতেই দেশের উন্নতির সোপান।
দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে সবার আগে। স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের যে মানচিত্র, ভাষা, পতাকা আর জাতীয় সংগীত আমরা পেয়েছি, তা আমাদের যে কোন মূল্যে অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, সবার আগে দেশ।
লেখক : প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সাউদার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।











