স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তৃণমূল থেকেই দুর্নীতিকে একেবারে না বলতে হবে। নিজে ঠিক থাকলে অন্যকে ঠিক করা যাবে। উন্নত বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে কাজ করতে হবে। ‘জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস–২০২৬’ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, মানুষের আয়ের পথ না বাড়লে উন্নতি হবে না, বিআরডিবির মূল কাজ হচ্ছে জনগণকে সম্পৃক্ত করা, সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণ দেয়া, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যে পণ্য উৎপাদন করে সেই পণ্যের বাজার তৈরি করা। সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, ঋণ মওকুফের মতো কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উন্নত দেশ গড়ার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বজায় রাখা হবে। একই সঙ্গে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ও শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না।
সংসদেও এ ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। সেখানে গয়েশ্বর রায় বলেছেন, ‘শুধু দুর্নীতি করব না বললেই হবে না। আমাদের দরকার শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা। দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নিশ্চিত করতে পারলে বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় দুর্নীতির কারণে সরকার ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
দুর্নীতিকে যতই আমরা না বলি, ততই যেন আমাদের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। দুর্নীতি সবাইকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। দেশে এমন কোনো খাত নেই যেখানে দুর্নীতির অশুভ থাবা প্রভাব বিস্তার করেনি। প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে উঁকি দিচ্ছে, চোখ পাকাচ্ছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। কেবল অভাবের তাড়নায় মানুষ দুর্নীতি করে–এটি সত্য নয়। বিত্তশালী কর্মকর্তা বা ব্যক্তি আরো অর্থ সম্পদের জন্য দুর্নীতি করে। মানুষের মধ্যে নীতি–নৈতিকতার ঘাটতি হলেই দুর্নীতি জেঁকে বসে। দুর্নীতির দুষ্টচক্র দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট বাধা হিসাবে কাজ করছে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা–কর্মচারীদের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য সরকার বেতনভাতা বৃদ্ধি করলেও তা না কমে বরং আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী এ কনভেনশন বা সনদে বলা হয়েছে যে, দুর্নীতি সমাজের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে, গণতান্ত্রিক কাঠামো, নৈতিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ন করে এবং টেকসই উন্নয়ন ও আইনের শাসনকে বিপন্ন করে। সুতরাং এ কনভেনশনকে দক্ষতার সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রযুক্তিগত সহায়তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার মাধ্যমেই কেবল দুর্নীতিকে সহনশীল মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
বিশ্লেষকরা বলেন, একধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে দেশে। তাতে পরোক্ষভাবে দুর্নীতিবাজদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করলে নাগরিকসমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের নাজেহাল হতে হয়। ফলে দুর্নীতিবাজরা এতে উৎসাহিত হয়। বাংলাদেশে আরও কয়েকটি কারণে দুর্নীতি কমানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল– রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতির ঘাটতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবহিদিতার অভাব, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অবস্থান সংকুচিত করে দেয়া এবং গণমাধ্যম ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিদের কথা বলার সুযোগ সীমিত করে দেয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমনের অভিযানকে সফল করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ–উদ্যমকে একযোগে কাজে লাগাতে হবে। তবে এই কঠিন লক্ষ্যে সফলতা অর্জনের একটি পূর্বশর্ত হচ্ছে দুর্নীতি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। যদি সংঘবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে দুর্নীতির কদর্য চেহারাকে পরিচিত করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এবং জনস্বার্থে এর কুফল সম্পর্কে তথা জনসচেতনতা সৃষ্টি করা যায়, তাহলে দেশ আরও এগিয়ে যাবে।





