দুর্দিনে বিএনপির কাণ্ডারী

| শুক্রবার , ১৪ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:০৪ পূর্বাহ্ণ

তৃণমূল থেকে নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উঠে এসেছেন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দমনপীড়নের মধ্যে সংগ্রামে অবিচল এই নেতা ছিলেন দলের ময়দানের কাণ্ডারী। গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশে এবার তিনি মহামান্য হয়ে যাচ্ছেন বঙ্গভবনে। ছাত্রজীবনে বামপন্থায় আস্থা রাখা এই নেতা টানা দেড় দশক ধরে বিএনপির মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রাম আর তিনটি গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়ে বিএনপি যেন তার ত্যাগের স্বীকৃতিই দিল। গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। খবর বিডিনিউজের।

শিক্ষকতা পেশা থেকে রাজনীতিতে আসা এই নেতার রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা। একজন সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে সবমহলে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মনোনয়ন দিয়ে বিএনপি দলের ভেতরে উদাহরণ তৈরি করল। অভাবনীয় কিছু না ঘটলে সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলই জয়লাভ করতে যাচ্ছেন। তিনি হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে নামেন চার দশক আগে। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের অঙ্গীকারে বেছে নেন এক সাধারণ জীবন। প্রাথমিকের কৃতি শিক্ষার্থী ঠাকুরগাঁওয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে।

তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অর্থনীতি বিভাগের কৃতি ছাত্র ছিলেন। ঢাকা কলেজে সবাই ভর্তি হতে পারে না, যদি ব্রিলিয়েন্ট রেজাল্ট না হয়। ফখরুল ছিলেন সেই পর্যায়ের ছাত্র। অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র বুঝতেই পারেন, পড়ালেখার চাপ কি পরিমাণ থাকে। এরপরও তিনি ছাত্র রাজনীতি করেছেনসেই রাজনীতির পথ ধরে জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। হি ইজ আ ব্রিলিয়েন্ট পারসন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি বাম ধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ১৯৬০ এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। মির্জা ফখরুল সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের মহাসচিব নির্বাচিত হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন এবং ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন। রাজনৈতিক কারণে সে সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল।

অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর শিক্ষাকতায় যোগ দিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন ১৯৭২ সালে। এরপর বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক পদে এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব পদে যোগ দেন। এরপর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে নেমে পড়েন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন।

মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন এবং মা মির্জা ফাতেমা আমিন। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি দুইবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। ছিলেন এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য।

বাবার মতো রাজনীতির পথ ধরলেও তিনি জাতীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেন আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিন্যাপে। সেখান থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি ছেড়ে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে যোগ দেন।

মির্জা ফখরুল ১৯৯০ সালে যোগদান করেন বিএনপিতে। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি এবং পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হন। তারপর ধাপে ধাপে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে উঠে আসেন। ২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলটির মহাসচিব নির্বাচিত হন। সেই থেকে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন কৃষক ফ্রন্ট থেকে আসা এই নেতা।

বিএনপির নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে আসার আগে মির্জা ফখরুল দলটির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন। রাজনীতির এই দীর্ঘ যাত্রাপথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মোকাবিলা করেছেন একএগারোর পট পরিবর্তন পরবর্তী প্রতিকূলতা। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সময়টাতে দমনপীড়ন, নির্যাতনে বার বার বিপর্যয়ের মুখে পড়া বিএনপিকেও অসীম ধৈর্যে সংগ্রামে অটল রেখেছেন।

শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব। বহু মামলা লড়ার পাশাপাশি তাকে তিন দফা কারাগারেও যেতে হয়েছে। দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির সংকটে হাল ধরে থাকা এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে দেশের ভেতরে কার্যত দলটির মূল নেতৃত্বে ছিলেন মির্জা ফখরুল।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাবাসসুম বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরে মহাসচিব হিসেবে দলের ভেতরেবাইরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক সভাসমাবেশে তিনি যে ভাষায় বক্তব্যে দেন, তা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এজন্য দলমত নির্বিশেষে সকলে উনাকে সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে সম্মান করেন, কোনো বির্তক ছাড়াই।

বিএনপিতে যোগ দেওয়ার প্রায় এক দশক পর ২০০১ সালে মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত সরকারে কৃষি এবং বেসরকারি বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও১ এবং বগুড়া৬ আসনে প্রার্থী হন। বগুড়া৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও সারাদেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে সংসদে যাননি তিনি, যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনটিই তার।

বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির দুর্দিনে যেভাবে দলকে আগলে রেখেছেন, দলের পতাকাকে উড্ডীন রেখেছেন, সেজন্য তিনি রাষ্ট্রপতির আসনে বসার সম্মান পেতেই পারেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলা, জেসমিন আক্তার কারাগারে
পরবর্তী নিবন্ধরাষ্ট্রপতি হচ্ছেন মির্জা ফখরুল