বিনিয়োগের ‘ফাঁদ’–এ ফেলে ৩৮ নারীর দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎকারী আলোচিত সেই জেসমিন আক্তার রানীকে অবশেষে কারাগারে যেত হল। প্রতারণা করে ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের একটি মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার জামিন আবেদন করেন তিনি। আদালত শুনানি শেষে তার জামিন না মঞ্জুর কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আলাউদ্দিন–এর আদালত এ নির্দেশ দেন। একই মামলার অপর আসামি রানীর বাবা এস কে সাইফুল্লাহর বয়স বিবেচনা করে জামিন দেয় আদালত।
জেসমিন আকতার রানী নগরের খুলশী টাউন সেন্টারের ‘জ্যাজটানা বুটিক ওয়ার্ল্ড (প্রি লাভড রেন্ট বাই জ্যাজটানা)’-এর স্বত্বাধিকারী। তার ক্রেতাদের কাউকে ‘লভ্যাংশের আশ্বাস’ আবার কাউকে ‘পার্টনার’ করার লোভ দেখিয়ে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন তিনি। এসব ‘প্রলোভন’ ও বিনিয়োগের ‘ফাঁদ’–এ পড়ে তার হাতে ৩৮ নারী ক্রেতা তার হাতে তুলে দেন কোটি টাকার বেশি। এরপর চলে যায় কয়েক মাস। লভ্যাংশ তো দূরের কথা, মূলধনও ফেরত দেয় না বলে অভিযোগ করেন বিনিয়োগকারীরা। এমন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ৮টি মামলা হয়েছে। গত ১৯ জুলাই দায়ের হওয়া একটি মামলায় তার স্বামী জাবের আবদুল্লাহ দোভাষকেও আসামি করা হয়। এদিকে গতকাল যে মামলায় রনীকে কারাগারে পাঠিয়েছে মামলার বাদী ফাতেমা সুলতানা নামে এক গৃহিণী। তিনি গত ২৮ জুলাই চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলার আবেদন করেন আদালত ‘এফ আই আর’ হিসেবে তা গণ্য করে ৩ দিনের মধ্যে আদালতকে অবহিত করার জন্য খুলশী থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।
বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নাঈম ভূইয়া আজাদীকে বলেন, মামলাটির মূল অভিযোগ ছিল ফাতেমা সুলতানা, তার দুই মেয়ে এবং স্বামীসহ পুরো পরিবারের কাছ থেকে মোট ২২ লাখ টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন রানি জেসমিন আক্তার ও তার বাবা। রানির বাবা আন্ডারটেকিং দিয়ে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও কোনো টাকা দেননি। এটা মূলত প্রতারণা করেছে তারা। রানীর এ ধরনের প্রতারণার শিকার হওয়া ৩৮ জনের তথ্য জানা গেছে। ফাতেমার মামলাটি দায়েরের পর সার্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে মাননীয় আদালত এটিকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
আইনজীবী জানান, ফাতেমা আসামি গত পরশু অন্য একটি মামলায় আদালতে সারেন্ডার (আত্মসমর্পণ) করেছিলেন। তখন তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে খুব শিগগিরই সবার পাওনা টাকা মিটিয়ে আপস করে ফেলবেন। এরপ্রেক্ষিতে আদালত তাকে জামিন দেয়। কিন্তু জামিন পাওয়ার পরপরই রানীর মনোভাব ও আচরণ পুরোপুরি বদলে যায়। তিনি ভুক্তভোগীদের বলতে শুরু করেন, ‘আমি তো জামিন পেয়ে গেছি, তোরা তো আমাকে জেলে ঢোকাতে পারলি না’!
অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নাঈম ভূইয়া বলেন, আজ (গতকাল বৃহস্পতিবার) শুনানির সময় আসামিপক্ষে দু’জন সিনিয়র আইনজীবী দাঁড়ান। আদালত জিজ্ঞেস করেন তারা আপস করবেন কি না। তখন আমরা আদালতকে বলি– যিনি জামিন পেয়েই নিজের আচরণ বদলে ফেলেন এবং টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাকে আজ আবার জামিন দিলে তিনি নিশ্চিত দেশ ছেড়ে পালাবেন। তিনি (রানী) সবার কাছে এক–দুই মাসের সময় চাইছেন, কিন্তু যে টাকাগুলো তিনি আত্মসাৎ করেছেন, সেগুলো কোথায়? তিনি যদি সত্যিই আপস করতে চান, তবে আত্মসাৎকৃত টাকার অন্তত কিছু অংশ আদালতে জমা দিক, যাতে বিশ্বাস করা যায় যে তিনি পালাবেন না। কিন্তু আসামি পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে তিনি এখন কোনো টাকা দেবেন না। তার মানে রানীর ইনটেনশন ক্লিয়ার সে পালাবে।
নাঈম ভূইয়া বলেন, আমাদের বক্তব্য শুনে আদালত কনভিন্সড হল– ‘আপনি যদি সত্যিই আপস করতেন, তো কিছু টাকা–পয়সা নিয়ে আসতেন, অল্প হোক বেশি হোক নিয়ে আসতেন। কিছুই না নিয়ে এসে আপনি জামিন চাচ্ছেন! ওইদিনও জামিন দিলাম, তো আজকে তো দেওয়া যাবে না’। এরপর আদালত রানির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে সিডব্লিউ মূলে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। তার বাবার বয়সের বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় নিয়ে আদালত জামিন দেন।
এদিকে মামলার আরজি সূত্রে জানা গেছে, ফাতেমা সুলতানা ও তার পরিবারের সদস্যরা জেসমিনের দোকান থেকে নিয়মিত কেনাকাটা ও কাপড় ভাড়া করতেন। ওই হিসেবে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়। একপর্যায়ে ফাতেমা সুলতানাকে ‘জ্যাজটানা বুটিক ওয়ার্ল্ড (প্রি লাভড রেন্ট বাই জ্যাজটানা)-এ বিনিয়োগ করে পার্টনার করার প্রস্তাব দেন জেসমিন। এছাড়া অধিক বিনিয়োগ করলে বিভিন্ন স্লটে বেশি পরিমাণ লভ্যাংশ দেয়ার কথা জানান। এতে বিশ্বাস করে ১৯ দফায় ১৬ লাখ ২০ হাজার টানা বিনিয়োগ করেন ফাতেমা। এর মধ্যে তার দুই মেয়ে ও স্বামীরও টাকা রয়েছে।
ফাতেমাকে রানী বলে– ‘বিনিয়োগ করে পার্টনার হয়ে যান। কাপড় চোপড় ভাড়ায় নিতে হবে না আর। অধিকন্তু বিনিয়োগ করিলে প্রতি লক্ষ্য টাকায় মাসিক সাত হাজার টাকাসহ বিভিন্ন স্লটে অধিক পরিমান লভ্যাংশ প্রদান করা হইবে। ইতোমধ্যে অনেকেই বিনিয়োগ করে প্রচুর পরিমানে আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছে’। প্রস্তাবে রাজি না হলে জেসমিনের বাবা সাইফুল্লাহ নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করা যাবে বলে আশ্বস্ত করেন ফাতেমাকে। ফাতেমার দাবি, লভ্যাংশসহ এটা টাকা ২২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা হবে।











