রেলওয়ের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বছর বাড়ছে নতুন নতুন কোচ ও ওয়াগনের সংখ্যা। কয়েক বছর পরপর যুক্ত হচ্ছে ইঞ্জিন। প্রতি বছরই বাড়ছে নতুন নতুন রেলপথের সংখ্যা। নতুন জেলার সঙ্গে সংযোগ হচ্ছে। সেই সাথে পর্যটন নগরীগুলোর সঙ্গেও রেলপথের সংযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। নতুন নতুন রেলপথ এবং রেলের কোচ–ওয়াগন বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না মেরামত সক্ষমতা। পুরনো কারখানায় পুরনো যন্ত্রপাতিতে কোচ, ওয়াগন ও ইঞ্জিনের কাজ চলছে পুরনো পদ্ধতিতে। বছরের পর বছর মেরামত ও সংস্কার করে পুরনো যন্ত্রপাতি সচল রাখা হয়েছে। নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত না থাকায় অনেক কাজ করতে হচ্ছে পুরনো পদ্ধতিতে।
বহর বাড়ছে, বাড়ছে না মেরামত সক্ষমতা : রেলওয়ের উন্নয়নের সঙ্গে নতুন কোচ ও ওয়াগনের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে মেরামত সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পাহাড়তলী রেলওয়ে কারখানার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রকৌশলীরা। পুরনো যন্ত্রপাতি, জনবল সংকট ও বাড়তে থাকা কোচ–ওয়াগনের চাপ নিয়ে চলছে রেলের গুরুত্বপূর্ণ মেরামত কারখানা।
পাহাড়তলী কারখানার সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের অভিযোগ, রেলের বহরে নতুন কোচ ও ওয়াগন যুক্ত হলেও মেরামত অবকাঠামো সেই অনুপাতে বাড়েনি। এতে কারখানার ওপর চাপ বাড়ছে, অথচ সক্ষমতা বাড়ছে না। লোকবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অর্থ বরাদ্দ দিলে দিনে প্রায় ৬টি গাড়ি মেরামত শেষে কারখানা থেকে বের করা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে ২টি গাড়ি বের করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
৪৪৯ যন্ত্রপাতির মধ্যে ২৭১টির বয়স ৫০–৮০ বছরের বেশি : পাহাড়তলী কারখানার সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়কের দপ্তর থেকে জানা গেছে, কারখানায় থাকা ৪৪৯টি যন্ত্রপাতির মধ্যে ২৭১টির বয়স ৫০ থেকে ৮০ বছর বা তারও বেশি। অথচ এসব যন্ত্রপাতির নির্ধারিত আয়ুষ্কাল ২০ বছর। মাত্র প্রায় ১২ শতাংশ যন্ত্রপাতির নির্ধারিত আয়ুষ্কাল এখনও অবশিষ্ট রয়েছে। অন্যদিকে ২ হাজার ২০০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১ হাজার ৫০ জন। এর মধ্যে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও ১০১ জন অবসরে যাবেন। ফলে জনবল সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৯৩০ কোচ ও ৬ হাজার ওয়াগনের চাপ : রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মেকানিক্যাল ও পরিবহন বিভাগের দুই কর্মকর্তা আজাদীকে জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলে রেলের কোচ রয়েছে প্রায় ৯৩০টি এবং ওয়াগন প্রায় ৬ হাজার। এসবের নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের চাপ সামলাতে হচ্ছে সীমিত জনবল ও পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে। এছাড়া জনবল ঘাটতি মেটাতে আলাদা একটি প্রকল্পের আওতায় অস্থায়ী শ্রমিক দিয়ে কোচ মেরামতের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাময়িকভাবে এভাবে চাপ সামলানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ও প্রশিক্ষিত জনবলের বিকল্প নেই।
রেলের ডিজেল শপের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী জানান, রেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হচ্ছে ইঞ্জিন। নিয়মিত ইঞ্জিন মেরামত করা হয় লোকোশেড এবং ডিজেল শপে। লোকোশেড হলো ট্রেনের ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভ রাখার এবং নিয়মিত ছোটখাটো পরীক্ষা করা (ইনস্পেকশন), পরিষ্কার করা এবং সাধারণ সারাই করার স্থায়ী ডেসপাচ বা পার্কিং গ্যারেজ।
ডিজেল শপ হলো ডিজেল ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভের বড় ধরনের ওভারহোলিং, হেভি রিপেয়ার বা ভারী যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক পুনর্গঠন কারখানা। যে হিসেবে প্রতিদিন পুরনো ইঞ্জিন মেরামত করা হচ্ছে সেই হিসেবে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অভিজ্ঞ লোকবল নেই। ফলে একটি ইঞ্জিন আজকে মেরামত করার পর কাল আবার মেরামতের জন্য ওয়ার্কশপে ঢুকানো হয়।
অভিজ্ঞরা যাচ্ছেন অবসরে, অস্থায়ী শ্রমিকে কাজ : পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপের একাধিক কর্মকর্তা–কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতি বছর অভিজ্ঞ শ্রমিকেরা অবসরে চলে যাচ্ছেন। প্রকল্পের আওতায় অস্থায়ী শ্রমিক দিয়ে কোচ মেরামতের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে সাময়িক চাপ সামলানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ও প্রশিক্ষিত জনবলের বিকল্প নেই।
কারখানার কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার জন্য বছরের পর বছর মেরামত ও সংস্কার করে পুরনো যন্ত্রপাতি সচল রাখা হয়েছে। নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত না থাকায় পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে পুরনো পদ্ধতিতে মেরামতের কাচ চালাতে গিয়ে সময় দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
নতুন ওয়ার্কশপ ও আধুনিকায়নের দাবি : শুধু নির্দেশনা দিয়ে পাহাড়তলী ওয়ার্কশপের সংকট দূর করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন কারখানার শ্রমিক–কর্মচারী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সকলে। তাদের দাবি, দ্রুত জনবল নিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, পর্যাপ্ত বাজেট এবং মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী অবকাঠামোর আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
কারখানার কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজনীয় লোকবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অর্থ বরাদ্দ পেলে বর্তমান কারখানার সক্ষমতা অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ১০১ জন অভিজ্ঞ কর্মী অবসরে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলের বহর যখন ক্রমে বাড়ছে, তখন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো পিছিয়ে থাকলে এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো রেল পরিবহন ব্যবস্থায়।
পাহাড়তলী বিভাগীয় চিফ পাওয়ার কন্ট্রোলার প্রকৌশল রাজেন্দ্র প্রসাদ ভৌমিক বলেন, বর্তমানে রেলের বহরে মোট ইঞ্জিন রয়েছে ২৯৭টি। এর মধ্যে মিটারগেজ ইঞ্জিন ১৬৭টি ও ব্রডগেজ ইঞ্জিন ১৩০টি। রেলট্র্যাকে যুক্ত হওয়ার পর একটি ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর। ৫১ শতাংশ ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়েছে। অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল রয়েছে রেলওয়েতে এমন ইঞ্জিনের সংখ্যা ১৪৭টি। বাকি ১৫০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সি ৫০টি ও ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সি রয়েছে ১৬টি। অবশিষ্ট ৮৪টি ইঞ্জিনের বয়স ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ডিজেলশপে দক্ষ লোকবল না থাকায় নতুন লোকবল দিয়ে ইঞ্জিন মেরামত করে আজকে দেওয়ার পর সেটি মেরামতের জন্য পরের দিন আবার ডিজেলশপে ঢুকাতে হয়। ইঞ্জিন মেরামতে যে মানের যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয় সেই মানের যন্ত্রাংশের অভাব রয়েছে। অপরদিকে ডিজেলশপে ইঞ্জিন মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নেই। প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন পাওয়া গেলে ট্রেন পরিচালনায় কোনো সমস্যা হবে না।












