(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
আমরা হাঁটছিলাম। বন্ধু স্বপন আমাকে রাতের হংকং দেখাচ্ছে। দিনের হংকং আর রাতের হংকং আকাশ পাতাল ব্যবধান। একটি শহরের যেন দুই চেহারা। দিনে শহরটিকে মনে হয় কর্মব্যস্ত এক বিশাল নগরী। মানুষ ছুটছে, গাড়ি ছুটছে, ট্রাম ছুটছে, ব্যবসা–বাণিজ্য চলছে। মানুষের দম ফেলার সময় নেই। দুনিয়ার ব্যস্ততা। আর সন্ধ্যা নামার পর সেই একই শহর হঠাৎ যেন সাজতে শুরু করে। একের পর এক ভবনের গায়ে আলো জ্বলে ওঠে। রাস্তার সাইনবোর্ডগুলো নীয়ন আলোয় ঝলমল করে। চারদিকে এতো আলো যে মনে হয় হংকংয়ে আলোর বান ডেকেছে।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ভিক্টোরিয়া হারবারের কাছে এসে দাঁড়িয়েছি বুঝতে পারিনি। কী সুন্দর, যেনো বুকের ভিতরে গিয়ে অন্যরকমের একটি আবহ তৈরি করে দিল। মনে হলো পুরো শহরটিই সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে।
এই হারবারে আমি আগেও এসেছি। বারবার আসতে ইচ্ছে করে। আজ রাতে হারবারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, এই জায়গাটিতে না এলে হংকংকে ঠিকঠাকভাবে বুঝে উঠা অসম্ভব। সামনে ভিক্টোরিয়া হারবার, ওপারে হংকং আইল্যান্ডের সুউচ্চ ভবনগুলোর সারি। সবগুলো ভবন থেকে যেনো ঠিকরে ঠিকরে আলো বেরুচ্ছে।
আকাশচুম্বী ভবনগুলোতে আলোর খেলা চলছে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে যেনো অসংখ্য আলোর মালা। হারবারের পানিতে আলোর প্রতিবিম্ব, সেগুলো থিরথির করে কাঁপছে। মনে হচ্ছিল, পানির নিচেও বুঝি আরেকটি শহর দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা গল্প করছিলাম। স্বপন আমাকে নানা কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিলো। আমি মনের সব শখ মিটিয়ে রাতের ভিক্টোরিয়া হারবার দেখতে লাগলাম।
হারবারের পাড়ে প্রচুর মানুষ। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা অসংখ্য পর্যটক। কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ পরিবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তরুণ–তরুণীদের হাসি, শিশুদের ছোটাছুটি, ক্যামেরার ক্লিক–সব মিলিয়ে চারপাশ অসম্ভব প্রাণবন্ত। আমি শুধু সৌন্দর্য অনুধাবন করছিলাম, একেবারে বুকের ভিতরে হারবারের স্মৃতি একজনমের জন্য জমিয়ে নিচ্ছিলাম। আর কখনো হংকং আসা হবে কিনা জানি না, তবে ভিক্টোরিয়া হারবারের এমন মনোরম রাত এক জীবনে ভুলবো না।
ভিক্টোরিয়া হারবারের সৌন্দর্যের আরেকটি দিক হলো ক্রুজিং। পানিতে ছোট–বড় অসংখ্য নৌযান চলাচল করছে। সবগুলো রঙ–বেরঙের আলো জ্বলছে। প্রতিটি নৌযানে উৎসবমুখর মানুষ। কোনো নৌযান ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে, কোনোটি কিছুটা দ্রুত। কোনটি জেটিতে এসে ভিড়ছে, কোনোটি গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
হারবারের ওপারে তাকালে চোখে পড়ে অসংখ্য সুউচ্চ ভবন। হংকংয়ের আকাশচুম্বী স্থাপনাগুলো আমাকে সবসময়ই বিস্মিত করেছে। এত অল্প জায়গার মধ্যে এত মানুষকে নিয়ে একটি আধুনিক শহর কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে–এটি ভাবলেই অবাক হতে হয়। ভবনগুলো শুধু উঁচু নয়, অনেক উঁচু। এগুলোর নকশা ও আলোকসজ্জা রাতের শহরকে দিয়েছে এক অন্যরকম সৌন্দর্য।
চারদিকে অতিরিক্ত আলো, এতো বেশি আলো যে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিলো। আমার মনে হলো, এতো আলো না হলেও চলতো। কিন্তু হংকংয়ে রাস্তার আলো, দোকানের আলো, ভবনের আলো, নৌযানের আলো–সব মিলিয়ে রাতের হংকং যেনো এক আলোকনগরী, স্বপ্নপুরী।
হারবারের পাশে দাঁড়িয়ে আমার খুব নিজের শহর চট্টগ্রামের কথা মনে পড়ছিল। আমাদের কর্ণফুলী নদী আছে, নদীর ওপারে জায়গাও আছে। কিন্তু ভিক্টোরিয়া হারবারের সাথে তুলনা করার মতো কিচ্ছু আমাদের নেই। অথচ কর্ণফুলী নদীতে ক্রুজ চালু করা যেতো, নদীর ওপারে শহরটিকে গড়ে তোলা যেতো, কিন্তু হয়নি। প্রকৃতি আমাদেরকে যা দিয়েছে আমরা শুধু তাকে ধ্বংস করে চলেছি। নদীর নিচে পলিথিনের পাহাড় বানিয়েছি, নদীকে ভাসমান গুদাম হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া লাইটারেজ জাহাজের নোঙর করার জায়গা বানিয়েছি, অথচ নদীকে সাজাতে পারিনি।
রাত বাড়ছিলো, আমাদের ধারে কাছে ভিড়ও কমে যাচ্ছিলো। কিন্তু শহরের আলো কমেনি। আলোর এই ঝলকানি কি রাতভর চলবে! এখানে কি লোডশেডিং নেই! নানাকিছু ভাবছিলাম। নিজের দেশ নিয়ে, নিজের শহর নিয়ে।
ভিক্টোরিয়া হারবারের পাড়ের ভিড় কমে গেছে, মানুষজন ফিরতি পথ ধরেছে। হারবার নিজের সৌন্দর্য নিয়ে বহাল থাকলেও আমাদের ঘরে ফিরতে হবে। আমি শেষবারের মতো হারবারের দিকে তাকালাম। কালো পানির ওপর অসংখ্য আলোর প্রতিচ্ছবি। ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলো যেন আকাশ ছুঁয়ে আছে।
বন্ধুকে বললাম, চল,ফিরতে হবে। অনেক রাত হয়ে গেলে বাসার লোকজনের সমস্যা। আমার জন্য দরোজা খুলে বসে থাকতে হবে। অবশ্য, ইতোমধ্যে ভাবীকে ফোন করে রাতে খাবো না জানিয়ে দিয়েছি। শুধু ড্রাইভারটাকে দরোজা খুলে দিতে বলে দেয়ারও অনুরোধ করেছি।
স্বপন ও আমি হেলে দুলে হাঁটছিলাম। বিশাল ফুটপাত, চমৎকার হাঁটার রাস্তা। কোন হকার নেই, হোমলেস নেই, নেই কোন ঝামেলা। ছিনতাইকারী চাকু ধরে সবকিছু কেড়ে নিয়ে যাবে এমন ভয়ও নেই। এক একটি ভবনের পুরো দেয়াল যেনো টিভির পর্দা। নানা বিজ্ঞাপন চলছে। প্রচুর আলো, সারা গায়ে আলো মেখে মেখে হাঁটছিলাম আমরা।
স্বপন আমাকে নিয়ে একটি রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করলো। বললো, এটি মুসলিম রেস্টুরেন্ট, হালাল খাবার বিক্রি করে। চোখ বন্ধ করে সবকিছু খেতে পারবি।
আমি মাথা নাড়লাম। টেবিলে বসতেই ওয়েটার এসে গরম পানিতে ভেজা তোয়ালে দিয়ে গেলো। হাত মুখ মুছে ফেললাম। ম্যানু কার্ড দিল। কি খাবো জানতে চাইলো স্বপন। অথেনটিক চাইনিজ খাবো কিনা জানতে চাইলো, পরে নিজেই উত্তর দিলো যে, অথেনটিক চাইনিজ খেতে পারবি না। তোরা দেশে চাইনিজের নামে যেগুলো খাস, সেগুলো আসলে চাইনিজ খাবার না। চাইনিজের সাথে অন্যান্য অনেক কিছু মিলে একটা জখাখিঁচুড়ি মার্কা খাবার তৈরি করা হয়েছে। আমি হাসলাম। বললাম, হালকা কিছুর অর্ডার দে, রাতে বেশি ভারী খাবার খাবো না। স্বপন আমাকে ধমক দিলো। বললো, ‘যতটুকু হেঁটেছিস, পুরো হাতি খেয়ে ফেলা যাবে।’ তোদের এখানে কি হাতিও হালাল আইটেম নাকি! স্বপন হাসলো।
ব্যাটা কত কিছুর যে অর্ডার দিলো! পোলাও, নানরুটি। চিকেন ফ্রাই, রোস্ট ডাক, বীফ স্টেক। কাবাবসহ আরো কি কি সব খাবার। ঝোল করে রান্না করা একটি খাবারও ছিল। স্বপন আমাকে জোর করে খাওয়ালো। খেতে খেতে মনে হচ্ছিলো, স্কুল জীবনের বন্ধুটির আজ কতগুলো টাকা খরচ হয়ে গেলো!
স্বপনের আগে টেবিল ছেড়ে আমি বিল দিতে গেলাম। সে এমনভাবে হৈ হৈ করলো যে, যেনো দোকানে ডাকাত পড়েছে। ক্যাশে বসে থাকা চ্যাপ্টা নাকের সুন্দরী মহিলাটি আমার কার্ডটি দ্রুত ফেরত দিয়ে দিলো।
রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে স্বপন আমাকে নিয়ে একটি ক্যাফেতে ঢুকলো। আমি কখন যে তাকে বলে ফেলেছিলাম যে, আমি সারাদিনই চা কফির উপর থাকি। মাঝরাতেও চা কফি খাই। কথাটি স্বপন মনের ভিতর গেঁথে নিয়েছে। এখন ভরপেট খাওয়ার পর আমাকে আবার কফির দোকানে নিয়ে ঢুকেছে। স্বপন আমার জন্য একটি কফি নিলো, নিজের জন্য জুস। সে বললো, এতো রাতে কফি খেলে সারারাত নাকি তার ঘুম ধরবে না। বললাম, আমি মধ্যরাতের অশ্বারোহী ভাই, সারারাত না ঘুমালেও সমস্যা হবে না।
ঢাকনা দেয়া কফির মগ হাতে নিয়ে আমরা ক্যাফে ছাড়লাম। হাঁটতে হাঁটতে চুমুক দিচ্ছিলাম। স্বপন আমাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে ঘরে ফিরবে। সে আমাকে ভাবীর বাসায় পৌঁছে দেয়ার কথা বলেছিলো, আমিই না করে দিয়েছি। সে অবশ্য আমাকে আশ্বস্ত করেছে যে, ডিরেক্ট ট্রেন, স্টেশনে নামলেই হলো। কত স্টেশন পরে নামবো সেটিও বলে দিলো। তাকে আশ্বস্ত করলাম যে, ট্রেনটি ধরিয়ে দে, আমি ঠিকঠিক স্টেশনে নামতে পারবো।
স্বপন আমার থেকে বিদায় নিলো। বললো, কাল ফ্রি হয়ে কল দিস। বিকেলের দিকে ফ্রি হয়ে যাবো। অন্য কোথাও তোকে ঘুরাতে নিয়ে যাবো। আমি আচ্ছা বলে ট্রেনে চড়ে বসলাম।
জানালার পাশে বসে দরোজার উপরের স্ক্রিনে চোখ দিয়ে বসে আছি। ওখানে পরবর্তী স্টপেজগুলোর নাম একটির পর একটি এগিয়ে আসছিলো। আমার গন্তব্য এখনো বেশ দূরে বুঝা যাচ্ছিলো। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।












