চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে বিপর্যয় ঘটেছে। এটা অনেকের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, খাতা কলমের মূল্যায়নে ফলাফল প্রকাশের পর দেখা মিলল এক অভাবনীয় ও হতাশাজনক চিত্র। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এবারের মাধ্যমিক (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার এবং জিপিএ–৫–দুই সূচকে দেখা গেছে বড় ধরনের পতন। গত বছরের সমীকরণকে উল্টে দিয়ে পাসের হার এক ধাক্কায় নেমে এসেছে ৫৯.৪৮ শতাংশে। মানবিক বিভাগের ভয়াবহ ফল এবং জিপিএ–৫ পাওয়ার সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে এখন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মাঝে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা ও গুণন–ভাগ।
চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। জিপিএ–৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৬৯৮ জন। গতবারের তুলনায় এবার পাসের হার ও জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুটিই কমেছে। গত বছর পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ। জিপিএ–৫ পেয়েছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন চট্টগ্রাম ছাড়াও কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয়। এসএসসিতে এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় উপস্থিত ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন। পাস করেছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন। এবার ছাত্রদের পাসের হার ৫৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ছাত্রীদের পাসের হার ৬০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। গতবারও ছাত্রীদের পাসের হার ছাত্রদের চেয়ে কিছুটা বেশি ছিল।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরে পাসের হার ৭৪ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৮১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলায় এবার পাসের হার ৫৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭১ দশমিক ২৯ শতাংশ। বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফলও এবার আগের বছরের তুলনায় খারাপ হয়েছে। এবার ২১টি বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। গত বছর এমন বিদ্যালয় ছিল ৩৩টি। অন্যদিকে এবার আটটি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল একটি।
বিশ্লেষকরা বলেন, ফল প্রকাশের পর থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনস্তত্ত্বে কাজ করছে মিশ্র অনুভূতি। যারা কৃতকার্য হয়েছে, তাদের ঘরে উল্লাস থাকলেও সার্বিক সূচক দেখে অধিকাংশ অভিভাবকই প্রকাশ করেছেন গভীর উদ্বেগ। বিশেষ করে মানবিক বিভাগে এ ধরনের অস্বাভাবিক ধস এবং এক বছরেই পাসের হার ১২ শতাংশেরও বেশি কমে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে ইঙ্গিত করছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
হঠাৎ ফলাফলের এই বড় পতন কি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের কঠোরতার কারণে, নাকি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যমুখী করায় গাফিলতি ছিল? শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং মানবিকে এই ধসের কারণ উদঘাটনে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এখন শিক্ষা মানে জিপিএ–নির্দেশক একটি সার্টিফিকেট। সেটি কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কতটা সুবিধা দেবে কিংবা চাকরির বাজারে কতটা এগিয়ে রাখবে, এটা নিয়েই ভাবনা সবার। জিপিএ–৫ নিশ্চিত করার জন্য অভিভাবকেরা সবকিছু করতে প্রস্তুত থাকেন। কিন্তু এই জিপিএ ও নম্বর শিক্ষার্থীর দক্ষতা বা পারদর্শিতা যথাযথভাবে নির্দেশ করে না। আর কৃতকার্য–অকৃতকার্যের হার দেখে কিংবা আগের বছরগুলোর সঙ্গে তুলনা করে শিক্ষার অগ্রগতি–উন্নতি নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়।
ভালো শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করে দেয় এবং জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার কোন পর্যায়ে শিক্ষার্থী কতটুকু দক্ষতা অর্জন করবে, তা পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করা থাকে। ভালো শিক্ষাব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের রূপ বা ধরন বদলে নিতে পারে। পুরো প্রক্রিয়াটি হয় শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক এবং তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক। শিক্ষা গ্রহণের জন্য নানা রকম উপাদান ও উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ থাকে। বারবার অনুশীলন ও পরীক্ষণের মাধ্যমে নতুন নতুন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়। শিক্ষার্থীকে যাচাই ও মূল্যায়ন করার জন্য বৈচিত্র্যময় উপায় থাকে। অর্জিত শিক্ষা শিক্ষার্থীর মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। তা ছাড়া ভালো শিক্ষাব্যবস্থায় সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংযোগ তৈরি হয়।
কোনো ধরনের শিক্ষায়ই নম্বর বা জিপিএ–প্রধান হতে পারে না; বরং শিক্ষার্থীর দক্ষতা অর্জনের দিকটি প্রধান। দক্ষতা অর্জনকে গুরুত্ব দিয়েই শিক্ষাকাঠামো পরিচালিত হওয়া উচিত।







