‘তোমরা ঘুমিয়ে পড়ো, মাকেও ঘুম পাড়িয়ে দাও’

দেশে থাকা ভাইকে বলা সর্বশেষ কথা নিহত ৪ জনের মরদেহ আসতে পারে মঙ্গলবার

রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি | রবিবার , ১৭ মে, ২০২৬ at ৫:৫০ পূর্বাহ্ণ

ওমানে মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত চার প্রবাসী ভাইয়ের মৃত্যুর চার দিন পর গণমাধ্যমের সামনে মুখ খুলেছেন দেশে থাকা তাদের একমাত্র ভাই এনাম উদ্দিন। গতকাল শনিবার দুপুরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি সেদিনের সেই দুঃসহ রাতের স্মৃতিচারণ করেন। নিহত ভাইদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে এনাম উদ্দিন বলেন, আমার ভাইয়েরা সৎ ও সজ্জন মানুষ ছিলেন। পানসিগারেট কিংবা কোনো ধরনের বাজে নেশা তাদের ছিল না। আমরা পাঁচ ভাই সবসময় এক মন, একপ্রাণ ছিলাম। বড় ভাই ছিলেন আমাদের অভিভাবক, বাবার মতো। আবার অনেক ক্ষেত্রে আমিও ছিলাম তাদের ভরসাস্থল। নিজেদের মধ্যে কোনোদিন কোনো কিছু গোপন ছিল না। যা করার সবাই মিলেই একসাথেই করতাম।

তিনি জানান, গত ১৫ মে শুক্রবার দুই ভাইয়ের দেশে আসার কথা ছিল। সেজন্য গত ১৫ দিন ধরে তারা কোনো কাজে যাননি। আনন্দে ঘুরে বেড়িয়েছেন, কেনাকাটা করেছেন এবং কার কী লাগবে তা ফোনে প্রতিনিয়ত জেনেছেন। আগের ঈদে বড় দুই ভাই দেশে এলেও এবার সবার পরিকল্পনা ছিল একসাথে কোরবানি ঈদ করা এবং আনন্দ করা। কিন্তু এক নিমিষেই সব শেষ হয়ে গেল। চার ভাই একসাথে লাশ হয়ে দেশে ফিরছেন। নিহতদের মধ্যে বড় ভাই রাশেদের আড়াই বছরের একটি কন্যাসন্তান ও তিন মাস বয়সী একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। মেজো ভাই শাহিদুল বিবাহিত হলেও নিঃসন্তান ছিলেন এবং বাকি দুই ভাই সিরাজুল ও শাহেদ অবিবাহিত ছিলেন।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এনাম বলেন, ১৫ মে শুক্রবার দুই ভাইয়ের টিকিট কাটা ছিল। টিকিট ওকে আছে কি না তা দেখতে একদিন আগে তারা সবাই একসাথে মার্কেটে যায় এবং টিকিট কনফার্ম করার পর আমাদের ফোন করে জানায়। এর কিছুক্ষণ পর ছোট ভাই শাহেদ হঠাৎ বেহুঁশ হয়ে পড়ে। তখন সবাই কিছুটা ঘাবড়ে যায়। এ সময় ওমান থেকে ভাইয়েরা আমার সাথে যোগাযোগ রাখলে আমি তাদের দোয়াদরুদ পড়তে বলি এবং পানি দিয়ে শাহেদের হুঁশ ফেরানো হয়। এরপর বড় ভাই রাশেদ একটু বমি করায় তারা আর বাসায় না ফিরে সরাসরি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ওখানের একটি বাঙালি হাসপাতালের সামনে গাড়ি পার্ক করার পর একজন ভেতরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে ডাক্তার নেই, আসতে কিছুটা সময় লাগবে। ফলে তারা চিকিৎসকের জন্য গাড়ির ভেতরেই অপেক্ষা করতে থাকেন।

এনাম জানান, তাদের চারজনের কাছে মোট ছয়টি মোবাইল ছিল এবং পুরো সময় আমার সাথে তাদের যোগাযোগ চলছিল। সকাল থেকেই তারা বাড়িতে মা, ভাবিসহ সবার সাথে কথা বলেছে। সর্বশেষ রাত ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত আমার সাথে তাদের কথা হয়। চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় ফোনে তারা আমাকে সর্বশেষ বলেছিল, ‘তোমরা ঘুমিয়ে পড়ো, মাকেও ঘুম পাড়িয়ে দাও, কোনো অসুবিধা নেই।’ আমি ভেবেছিলাম বরাবরের মতো সাধারণ কোনো অসুস্থতা, ডাক্তার দেখালেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সকাল ৮৯টা বেজে যাওয়ার পরও যখন তাদের কোনো ফোন আসছিল না, তখন আমি ওমানে থাকা অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের ফোন নাম্বার জোগাড় করে যোগাযোগ করি। তখনই জানতে পারি আমার কলিজার টুকরো চার ভাই আর বেঁচে নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভিন্ন অপপ্রচার ও গুজবের বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এনাম উদ্দিন বলেন, মানুষ আসলে ঘটনা না জেনে নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। যারা এই বিপদে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, সহায়তা করছে, উল্টো তাদেরই দোষারোপ করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এই রকম কোনো বিষয় নেই। ওমান প্রশাসন অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বিষয়টি দেখছে। গাড়িতে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইলসহ সবকিছু বর্তমানে প্রশাসনের হেফাজতে নিরাপদে রয়েছে। এছাড়া তাদের বাকি স্বর্ণালঙ্কারসহ অন্যান্য জিনিসপত্রও সম্পূর্ণ সুরক্ষিত আছে এবং ওমান পুলিশ আমাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।

এই দুঃসময়ে সান্ত্বনা ও সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ওমান থেকে চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন ওমানের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন চৌধুরী সিআইপি এবং ওমানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আমার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন। ভিডিওকলে খোঁজ নিয়েছেন ভিপি নূর। এছাড়া আমাদের রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী ফোনে কথা বলার পাশাপাশি সশরীরে আমাদের এলাকায় এসেছেন, মসজিদে জুমা আদায় করেছেন এবং আমার সাথে কথা বলে গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। আমার বোনজামাই ও এলাকাবাসী শুরু থেকেই আমাদের পাশে থেকে সার্বিক সহায়তা করে যাচ্ছেন।

এদিকে বৃদ্ধ ও অসুস্থ মায়ের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে এখনও তাকে চার সন্তানের মৃত্যুর খবর বিশদভাবে জানানো হয়নি। একসাথে এত বড় শোক তিনি সইতে পারবেন না বিধায় পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে সত্যটা আড়াল করে রাখা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ আগামী মঙ্গলবার (১৯ মে) সরাসরি চট্টগ্রামে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বুধবার রাতে ওমানের দক্ষিণ আল বাতিনা গভর্নরেটের আলমাসানা এলাকায় একটি বদ্ধ গাড়ির ভেতর থেকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার একই পরিবারের চার প্রবাসী ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে রয়্যাল ওমান পুলিশ। ময়নাতদন্ত ও প্রাথমিক তদন্তের বরাতে জানা যায়, পার্কিং করা অবস্থায় গাড়িটির এসি চালু ছিল। দীর্ঘক্ষণ এসি সচল থাকায় গাড়ির এঙজস্ট থেকে নির্গত বিষাক্ত ও গন্ধহীন কার্বন মনোঙাইড গ্যাস গাড়ির ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসকের অপেক্ষায় গাড়িতে বসে থাকা অবস্থায় সেই বিষাক্ত গ্যাস নিশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করলে ঘুমের ঘোরেই শ্বাসরোধ হয়ে চার ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ওমান পুলিশ পরবর্তীতে গাড়ির দরজা খুলে তাদের অচেতন মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

এদিকে রাঙ্গুনিয়ার আনন্দপুরী গ্রামটি এখন যেন এক নিস্তব্ধ পাথরের শহরে পরিণত হয়েছে, যেখানে চার ভাইয়ের লাশের অপেক্ষায় প্রহর গুণছে পুরো পরিবার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধহামের উপসর্গ নিয়ে আরো ২ শিশুর মৃত্যু, শনাক্ত ১০৮