সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের শরীরের বিশ্রাম দরকার। নবজাতকেরও প্রয়োজন মায়ের নিবিড় পরিচর্যা। সন্তানটি প্রথম, দ্বিতীয় নাকি তৃতীয়–এই শারীরিক ও মানবিক প্রয়োজন তার ওপর নির্ভর করে না। অথচ বাংলাদেশের শ্রম আইনে এমন একটি বিধান রয়েছে, যার কারণে সন্তান প্রসবের সময় কোনো নারী শ্রমিকের দুই বা ততোধিক সন্তান জীবিত থাকলে তিনি প্রসূতি কল্যাণ সুবিধার অর্থ পান না। সমপ্রতি এই বিধানের বৈধতা ও সাংবিধানিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট। ফলে মাতৃত্বকালীন সুবিধা কি কর্মজীবী নারীর অধিকার, নাকি সন্তানের সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল একটি সুবিধা–প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে।
গত ২৯ জুন হাইকোর্ট বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬–এর ৪৬(২) ধারাসহ সরকারি চাকরির সংশ্লিষ্ট বিধান এবং একই ধরনের অন্যান্য নিয়ম কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসানের করা জনস্বার্থের রিটের পর বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ আসিফ হাসানের বেঞ্চ এ রুল দেন। রিটে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সব কর্মজীবী নারীর জন্য সন্তানের সংখ্যা নির্বিশেষে সমান মাতৃত্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
বিষয়টি বুঝতে শ্রম আইনের বর্তমান বিধানটি দেখা দরকার। বাংলাদেশ শ্রম আইনের ৪৬(১) ধারা অনুযায়ী, যোগ্য নারী শ্রমিক সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখের আগের ৬০ দিন এবং প্রসবের পরের ৬০ দিনের জন্য প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা পাওয়ার অধিকারী। শর্ত হলো, সন্তান প্রসবের আগে তাঁকে সংশ্লিষ্ট মালিকের অধীনে অন্তত ছয় মাস কাজ করতে হবে। কিন্তু একই ধারার ২ উপধারায় বলা হয়েছে, সন্তান প্রসবের সময় তাঁর দুই বা ততোধিক সন্তান জীবিত থাকলে তিনি এই আর্থিক প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা পাবেন না; তবে অন্যভাবে ছুটি পাওয়ার অধিকার থাকলে সেই ছুটি পাবেন।
মাতৃত্বকালীন ছুটি ও আর্থিক সুবিধার উদ্দেশ্য কী? এটি কি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল, নাকি মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য, আয় ও কর্মসংস্থান সুরক্ষার ব্যবস্থা? আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মাতৃত্ব সুরক্ষার নীতিতে দ্বিতীয় ধারণাটিই প্রাধান্য পেয়েছে। ILO–এর Maternity Protection Convention, 2000 (No. 183) অন্তত ১৪ সপ্তাহ মাতৃত্বকালীন ছুটির মান নির্ধারণ করে এবং ছুটিতে থাকা নারীর জন্য নগদ সুবিধার কথাও বলে। এর উদ্দেশ্য হলো, সন্তান জন্মের কারণে কর্মজীবী নারী যেন এমনভাবে আয় হারিয়ে না ফেলেন যে নিজের ও শিশুর স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনই কঠিন হয়ে পড়ে। একই কনভেনশনে গর্ভাবস্থা ও মাতৃত্বের কারণে চাকরিতে বৈষম্য ও অন্যায্য বরখাস্ত থেকে সুরক্ষার কথাও রয়েছে।
বাংলাদেশে যে বিধানটি এখন আদালতের বিবেচনায় এসেছে, সেখানে তৃতীয় বা পরবর্তী সন্তান জন্মের সময় মায়ের শারীরিক প্রয়োজন বদলে যাচ্ছে না; বদলে যাচ্ছে তাঁর আর্থিক অধিকার। তার মানে একই প্রতিষ্ঠানে একই কাজ করা দুই নারী সন্তান প্রসব করলেও তাঁদের জীবিত সন্তানের সংখ্যার কারণে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে। রিট আবেদনকারীর যুক্তি হলো, মাতৃত্বকালীন ছুটিকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয় এবং এ ধরনের পার্থক্য সমতা, মর্যাদা ও মাতৃত্ব সুরক্ষার সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হাইকোর্ট এখনো এই বিধান বাতিল করেননি; বরং কেন এটি অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, সরকারের কাছে তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন। এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি।
প্রশ্নটির আরেক পাশে আছে নবজাতক। পরিবারের তৃতীয় সন্তান বলে একটি শিশুর জন্মের পর মায়ের পরিচর্যা, বুকের দুধ বা পারিবারিক আর্থিক নিরাপত্তার প্রয়োজন কমে যায় না। মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার আলোচনায় তাই শুধু মায়ের কর্মসংস্থান নয়, শিশুর স্বাস্থ্য ও পরিচর্যার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক সুবিধা না থাকলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের নারী শ্রমিকের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন হতে পারে। সন্তান জন্মের সময় চিকিৎসা ও সংসারের বাড়তি ব্যয় থাকে। একই সময়ে কর্মক্ষেত্র থেকে আয় কমে গেলে পরিবারে আর্থিক চাপ বাড়ে। একজন উচ্চ আয়ের কর্মীর হয়তো কিছুদিন বেতন ছাড়া থাকার সামর্থ্য থাকতে পারে; একজন কারখানা বা স্বল্প মজুরির শ্রমিকের ক্ষেত্রে সেটি অনেক বেশি কঠিন। ফলে একই বিধানের অভিঘাতও সবার ওপর সমান হয় না।
মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–এর অর্থনৈতিক দায় কে বহন করবে? ILO–এর আধুনিক মাতৃত্ব সুরক্ষা কাঠামো মাতৃত্বকে শুধু একজন নারী কর্মী ও তাঁর নিয়োগকর্তার ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখে না। Convention No. 183–এ নগদ সুবিধা সামাজিক বিমা, সরকারি তহবিল অথবা জাতীয় আইনে নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর পেছনে একটি বাস্তব কারণও আছে। মাতৃত্বের পুরো আর্থিক দায় যদি সরাসরি একজন নিয়োগকর্তার ওপর পড়ে, তবে সন্তান ধারণের বয়সী নারীকে চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিচ্ছা তৈরির ঝুঁকি থাকে। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যয় ভাগ করা সেই বৈষম্যের ঝুঁকি কমাতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থায় আরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ILO–এর Global Care Policy Portal–এ বাংলাদেশের মাতৃত্ব সুরক্ষা ব্যবস্থাকে Convention No. 183–এর মানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়নি। একই পদে বা সমমানের পদে মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তার ক্ষেত্রেও ঘাটতির কথা সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ তৃতীয় সন্তানের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও মাতৃত্ব সুরক্ষার বৃহত্তর কাঠামো নিয়েও আলোচনার প্রয়োজন আছে।
এখানে অবশ্য পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্বকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জনস্বাস্থ্য, নারীর প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য এবং শিশুর সুষ্ঠু বিকাশের জন্য সচেতন পরিবার পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরিবার পরিকল্পনা উৎসাহিত করার নীতি এবং সন্তান জন্মের পর একজন নারী শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও আয় সুরক্ষা–দুটি ভিন্ন বিষয়। একটি নীতি বাস্তবায়নের জন্য অন্য একটি মৌলিক শ্রমসুরক্ষা কমিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, বর্তমান আইনি বিতর্ক মূলত সেই প্রশ্নই তুলছে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত সব নারীর ক্ষেত্রে পুরোপুরি তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। পরিবার, সামাজিক চাপ, গর্ভনিরোধকের প্রাপ্যতা ও ব্যবহার, প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান এবং দাম্পত্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা–সবই এখানে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে শুধু সন্তানের সংখ্যা দিয়ে একজন কর্মজীবী নারীর মাতৃত্বকালীন অধিকার নির্ধারণ করলে তাঁর জীবনের এই জটিল বাস্তবতাগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়। হাইকোর্টের রুলটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কী হবে, সেটি আদালতের বিষয়। কিন্তু এই মামলা ইতিমধ্যে একটি প্রয়োজনীয় সামাজিক আলোচনা সামনে এনেছে। মাতৃত্বকে আমরা কীভাবে দেখি? একজন কর্মজীবী নারী সন্তান জন্ম দিলে রাষ্ট্র ও কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব কি তাঁর সন্তানের সংখ্যা গোনা, নাকি মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, মর্যাদা এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা?
আধুনিক কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্ব কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; এটি কর্মজীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতার অংশ। তাই মাতৃত্বকালীন সুবিধাকে দয়া বা পুরস্কার হিসেবে দেখার সুযোগও কমছে। এটি এমন একটি সামাজিক ও শ্রমসুরক্ষা, যার সুফল শুধু একজন মা পান না–পায় শিশু, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং শেষ পর্যন্ত সমাজও।
প্রথম সন্তানের জন্মের পর একজন মায়ের শরীর যেমন বিশ্রাম চায়, তৃতীয় সন্তানের জন্মের পরও চায়। প্রথম শিশুটি যেমন পরিচর্যা দাবি করে, তৃতীয় শিশুটিও করে। সেই সাধারণ সত্য থেকেই হয়তো প্রশ্নটি সবচেয়ে সহজভাবে করা যায়–সন্তানের ক্রম বদলালে মাতৃত্বের প্রয়োজন যদি না বদলায়, তবে মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা বদলাবে কেন?











