ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে বেড়েছে যন্ত্রাংশ চুরি, ঝুঁকিতে ট্রেন চলাচল

শুকলাল দাশ | বৃহস্পতিবার , ২০ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রামঢাকা বিভাগের রেলপথের সিগন্যাল সরঞ্জাম চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ট্রেন চালাচল চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। রেলওয়ের সিগন্যালিং বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত তিন ধরে চট্টগ্রামঢাকা রেলপথের বিভিন্ন স্টেশন ও সেকশন থেকে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান সিগন্যাল সরঞ্জাম চুরি হয়েছে। গত তিনমাসে এই চুরির মাত্রা বাড়লেও প্রায় গত ৬ মাস ধরে এই ধরনের চুরির ঘটনা ঘটছে। এতে সিগন্যালিং ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ার পাশাপাশি ট্রেন চলাচলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে জানা গেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আধুনিক সংকেত ব্যবস্থার তামার ক্যাবল, পয়েন্ট মেশিনের ক্যাবল, সিগন্যাল পোস্টের লেডার, সিগন্যাল আসপেক্ট, কন্ট্রোল বক্সসহ সরঞ্জাম নিয়মিত চুরি হচ্ছে। পাশাপাশি রেললাইনের ক্লিপও চুরি হচ্ছে। এতে সংকেত ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং সংকেত আদানপ্রদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পরিবহন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, দুই বিভাগের বিভিন্ন স্টেশন ও সেকশন থেকে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান সিগন্যাল সরঞ্জাম চুরির ফলে নিরাপদে ট্রেন চালাতে অনেক সময় চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। আগে এই ধরনের চুরির ঘটনা তেমন ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে সিগন্যালিংয়ের মূল্যবান ক্যাবল কেটে নিয়ে যাওয়ার ফলে সিগন্যালিং ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। এতে স্বাভাবিক ট্রেন চলাচলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাঘাত ঘটছে বলে জানান প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী।

এই ব্যাপারে ঢাকাচট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রুটে চলাচলরত একাধিক স্টেশন মাস্টার এবং ট্রেনের লোকোমাস্টার (ট্রেন চালক) আজাদীকে জানান, সঠিক সংকেত না পেলে চালক বিভ্রান্ত হতে পারেন, এতে সংঘর্ষ বা লাইনচ্যুতির আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি সময়মতো ট্রেন পরিচালনা ব্যাহত হয়, যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে। রেল লাইনে এই চুরি রোধে রেলওয়ের কঠোর নজরদারি, রেল লাইনের দুই পাশে স্থানীয়দের মাঝে সচেতনতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তা জরুরি বলে মনে করেন স্টেশন মাস্টার ও ট্রেন চালকরা।

ঢাকাচট্টগ্রাম রুটের আখাউড়ালাকসাম রেললাইনের সরঞ্জাম চুরির বিষয়ে অতিরিক্ত প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী (পূর্ব) কার্যালয় থেকে সমপ্রতি আখাউড়ালাকসাম ডাবল লাইনের প্রকল্প দপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেললাইন প্রকল্পের আওতায় সেকশন১ এলাকায় স্থাপিত সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি বারবার চুরি হচ্ছে। ফলে সিগন্যাল বিকলতা বাড়ছে এবং ট্রেন চলাচলে বিলম্ব ঘটছে। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের ব্যস্ততম রুটে এ ধরনের চুরি ট্রেন চলাচলে চরম ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে এবং রেলওয়েকে আর্থিক ক্ষতিতে ফেলছে বলে জানান প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রকৌশলীরা।

চট্টগ্রাম জংশন ক্যাবিন এলাকায় গত জুলাই থেকে চলতি আগস্ট পর্যন্ত ৯১০বারের মতো সিগন্যাল সরঞ্জামের বিভিন্ন পিন ও মালামাল চুরির ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে দামি পয়েন্ট মোটর এবং এর যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে।

এদিকে ফৌজদারহাট, ভাটিয়ারী ও কুমিরা সেকশনে চুরি খবর পাওয়া গেছে। প্রতিটি চুরির ঘটনার বিপরীতে সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ক্যাবল চুরির পরিমাণ আশঙ্কাজনক বেড়ে গেছে। আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নরসিংদী এলাকায় ৩২কোর, ২০কোর এবং ১০কোরসহ বিভিন্ন সাইজের সিগন্যাল তার কেটে নিয়ে গেছে দুষ্কৃতকারীরা। এমনকি সিগন্যাল পোস্টের লোহার সিঁড়ি, এলইডি লাইট এবং শান্ট সিগন্যালও চুরির হাত থেকে রেহাই পায়নি।

রেলওয়ের সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে প্রাপ্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মূলত পয়েন্ট মোটর, বিভিন্ন কোরের ক্যাবল (তার), সিগন্যাল পোল এবং ট্র্যাক সার্কিট সরঞ্জামই চোরচক্রের প্রধান লক্ষ্য। কারণ এসব সরঞ্জামের বাজার মূল্য অনেক বেশি।

ঢাকাচট্টগ্রামের পাশাপাশি কঙবাজার রুটেও সিগন্যালিংয়ের মূল্যবান ক্যাবল কেটে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

নতুন নির্মিত রেললাইন থেকে চুরি হচ্ছে সংকেত (সিগন্যাল) ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম। বিশেষ করে ঢাকাচট্টগ্রাম রেলপথের আখাউড়ালাকসাম রেলপথে চুরি বাড়ছে।

রেলওয়ের সিগন্যালিং বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরঞ্জাম চুরি যাওয়ায় স্বয়ংক্রিয় সংকেত ব্যবস্থা অনেক জায়গায় কাজ করে না। সেসব স্থানে ম্যানুয়োলি সংকেত দিতে হচ্ছে। অনেক সময় ট্রেন ধীরগতিতে বা থেমে থেমে চলায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজাপানি নাগরিকের আইফোন হারানোর দুই ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করল পুলিশ
পরবর্তী নিবন্ধদেড় দিনে ৪৭২ মামলা, চুরির চেষ্টায় গ্রেপ্তার ১