চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একইসাথে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তার তিন সহযোগী সন্ত্রাসীকে। যারা সবাই শুটার বলে পুলিশ জানিয়েছে। ভারতে পালানোর উদ্দেশ্যে বেনাপোল সীমান্তের দিকে যাওয়ার সময় যশোর শহরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তিন সহযোগীসহ ইমনকে গ্রেপ্তার করে যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের যৌথ টিম।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ডেভিড ইমন ও তার সহযোগী রায়হানসহ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারে জেলা পুলিশের একাধিক টিম দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। যশোর থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জে আরেকটি টিম রায়হানকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালালেও তিনি অল্পের জন্য পালিয়ে যায়। তাকেও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন পুলিশ সুপার।
বিভিন্ন ছবিতে ডেভিড ইমনের বেশ শানদার গোঁফ দেখা গেলেও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে এবং পরিচয় গোপন করতে সে গোঁফ শেভ করে ফেলে। ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারের খবরে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি দেখা দিয়েছে।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের কাছে খবর ছিল সন্ত্রাসী ইমন প্রাইভেটকারে করে যশোরের দিকে আসছে। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে নড়াইল–যশোর সড়কের ঝুমঝুম এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও তিন সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত অন্য তিনজন হল মোহাম্মদ শামীম, মোহাম্মদ সাফায়েত হোসেন ও আলভি ইসলাম আলিপ। গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাদের চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একটি বিশেষ টিমের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অভিযানে যশোর জেলা পুলিশের বিশেষায়িত একটি দল অংশ নেয় বলেও জানান যশোরের পুলিশ সুপার। পুলিশ সুপার বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যাওয়ার জন্য যশোর এসেছিলেন।
অনেকের ধারণা ছিল ডেভিড ইমন দেশের বাইরে থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। তবে তার অবস্থান সম্পর্কে কারো কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ছিল না। গতকাল পুলিশ বলেছে, ডেভিড ইমন চারদিন আগে ভারত থেকে দেশে প্রবেশ করে। এখানে অবস্থা বেগতিক দেখে সে আবারো ভারতে চলে যাচ্ছিল। ইমনের কাছে একটি দেশীয় এবং একটি বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে।
পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ইমনসহ চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় অপরাধ গ্রুপের নিয়ন্ত্রক বড় সাজ্জাদ দীর্ঘদিন দুবাইতে ছিলেন। তিনি গত বেশ কিছুদিন ধরে ভারতে অবস্থান করছেন। ডেভিড ইমন বড় সাজ্জাদের সাথে দেখা করতেই ভারতে যাতায়াত করছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার সকালে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পুরো অভিযান, তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার সংখ্যা, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, আত্মগোপনের কৌশল এবং পরবর্তী তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে।
ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারের আগে তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে বিদেশি অস্ত্র ও গুলিসহ আটক করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। গত রবিবার রাতে নগরের অঙিজেন–কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে মো. আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ (২৪) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে আসিফ একটি মামলার পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি। সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ জানান, আসিফকে গ্রেপ্তারের সময় তার কোমর থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন এবং দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে আরিফের প্যান্টের পকেট থেকে আরও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন নিজেদের ডেভিড ইমনের সহযোগী বলে স্বীকার করে। তারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, আধিপত্য বিস্তার এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র নিজেদের অনুসন্ধানের উদ্বৃতি দিয়ে জানায়, ইমন অত্যন্ত হিংস্র টাইপের মানুষ। তার কাছে ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে এবং বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র চালনায় বেশ দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তার ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ জানায়, ইমন গত ১৩ জুলাই বাকলিয়া এঙেস রোড এলাকায় ডিজিটাল ডটনেট (ডিডিএন) নামে ইন্টারনেট সেবাদানকারী কোম্পানির মালিককে ফোন করে ব্যবসা করতে হলে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং প্রতিমাসে দশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেয়ায় ওই কোম্পানির অফিসে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এর আগে গত জানুয়ারিতে সাবেক সংসদ সদস্য ও স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবর রহমান চৌধুরীর বাসায় গুলির ঘটনাতেও নাম আসে ইমনের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে দুবাইতে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে ইমন এবং রায়হান। বড় সাজ্জাদের এক সময়ের সহযোগী ছিলেন ভারতে মারা যাওয়া পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ম্যাঙন এবং গত নভেম্বরে বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী জনসভায় খুন হওয়া সরোয়ার হোসেন বাবলা। কারাগারে থাকা অবস্থায় তাদের দুজনের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বড় সাজ্জাদের দূরত্ব তৈরি হয়। এরপর সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন ছোট সাজ্জাদ ওরফে বুড়ির নাতি, রায়হান ও বোরহান। অস্ত্র চালানোর দক্ষতা এবং দুর্দান্ত সাহসের কারণে রায়হানই ইমনকে নেতৃত্বে নিয়ে আসেন। বিভিন্ন ধরনের দুঃসাহসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইমন খুবই অল্প সময়ে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পরপরই ইমনের উত্থান ঘটে বলেও পুলিশ জানিয়েছে। রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র, হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জে জেলা পুলিশের একটি টিম অভিযান পরিচালনা করে। তবে অল্পের জন্য তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাসিমুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, রায়হানও আমাদের গোয়েন্দা নেটে রয়েছে। যে কোনো সময়ই তাকে আমরা ধরতে সক্ষম হবো।
পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। ইমন ও রায়হান এই বাহিনীকে নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছে। একের পর এক ঘটনা ঘটালেও সে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল।
পুলিশের দাবি, সামপ্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধে বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করা, তাদের সহযোগীদের শনাক্ত করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারকে সেই ধারাবাহিক অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস, অস্ত্র সরবরাহকারী, সহযোগীদের অবস্থান এবং সামপ্রতিক বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হবে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গতরাতে শেষ খবরে জানা গেছে যে, জেলা পুলিশের বিশেষ টিম ডেভিড ইমন এবং গ্রেপ্তার অপর তিনজনসহ রাত এগারটা নাগাদ চট্টগ্রামে পৌঁছেছে।











