ডিজিটাল চট্টগ্রাম : তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ও রূপান্তর

| বৃহস্পতিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ

একুশ শতকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে মানবসভ্যতার মানচিত্র আর কেবল ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ নেই; ফাইবার অপটিক ক্যাবল, কোড এবং অদৃশ্য ডিজিটাল সিগন্যালের মধ্য দিয়ে তা নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও দীর্ঘ ঐতিহ্যের বন্দরনগরী চট্টগ্রামও এই বৈশ্বিক ডিজিটাল রূপান্তরের বাইরে নয়। কর্ণফুলীর চঞ্চল জলরাশি ও পাহাড়ঘেরা এই নগরী আজ শুধু জাহাজ ও ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক সজাগ, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বপ্নবাজ তরুণ প্রজন্মের ঠিকানা। যাদের আমরা ‘মোবাইল জেনারেশন’ বা ‘ডিজিটাল জেনারেশন’ হিসেবে অভিহিত করছি, তাদের হাত ধরেই চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্বায়নের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তন কেবল জীবনযাত্রার রূপান্তর নয়; এটি শত বছরের পুরোনো একটি জনপদের মানসিকতা ও কর্মপদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তনের প্রতিফলন, যা আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বিপ্লবের সঙ্গে সমান্তরালে এগিয়ে চলেছে।

আন্তর্জাতিক পটভূমির দিকে তাকালে দেখা যায়, একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে তথ্যপ্রযুক্তির ঢেউ আছড়ে পড়েছে। সিলিকন ভ্যালি থেকে এশিয়ার টেকনির্ভর শহরগুলো পর্যন্ত তরুণ প্রজন্ম প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা ও সীমাবদ্ধ কর্মসংস্থানের ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। ইন্টারনেট অব থিংস (ওড়ঞ), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) এবং স্মার্টফোনের সর্বব্যাপী প্রসারের ফলে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ এখন আর নিছক তাত্ত্বিক ধারণা নয়; বরং হাতের মুঠোয় থাকা একটি বাস্তবতা। উন্নত বিশ্বের তরুণরা যেভাবে কোডিং, ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপ সংস্কৃতির মাধ্যমে অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের তরুণরাও সেই ধারায় পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের যে লড়াই শুরু করেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব আজ অনস্বীকার্য। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে যে, আগামী দিনের বৈশ্বিক শ্রমবাজারে টিকে থাকতে ডিজিটাল দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গেই তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রাম তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগানোর এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে এক্সিড বাংলাদেশ, ক্রিয়েটিভ আইটি, এক্সট্রিম সলিউশনস, আল্টিমেট আইটি সলিউশন, নবো আইটি ও জেনটক্সের মতো ছোটবড় অনেক আইটি প্রতিষ্ঠানে উজ্জীবিত তরুণরা কর্মরত রয়েছে।

জাতীয় ও স্থানীয় প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। একসময় যে দেশে ল্যান্ডফোন সংযোগ পাওয়াই ছিল ভাগ্যের ব্যাপার, সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের ২জি থেকে ৩জি, ৪জি এবং পরবর্তীতে ৫জি প্রযুক্তির আগমন দেশের যোগাযোগব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে দিয়েছে। সরকারি পর্যায়ে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এবং পরবর্তী সময়ে আধুনিক স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের নানা স্লোগান ও নীতিমালার মধ্য দিয়ে দেশের তরুণ সমাজ প্রযুক্তির সঙ্গে আরও গভীরভাবে পরিচিত হয়েছে। রাজধানী ঢাকার বাইরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই শহরেও প্রযুক্তির বিস্তার ঘটেছে দ্রুতগতিতে, যার প্রমাণ মেলে প্রবর্তক মোড়, জিইসি সার্কেল, চকবাজার গোলজার মোড়, আইটি মার্কেট, চেরাগীর মোড় কিংবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চুয়েটের সবুজ চত্বরে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখা প্রাণোচ্ছ্বল তরুণদের দেখে। সরকারিবেসরকারি কলেজ এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণতরুণীরাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। গত দেড়দুই দশকে এই তরুণরাই ধীরে ধীরে দেশের মূলধারার প্রযুক্তি অর্থনীতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছে এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালার পাশাপাশি নিজেদের উদ্যম ও অতীতে নেওয়া বিভিন্ন সরকারিবেসরকারি উদ্যোগের ফলে এই অঞ্চলে কালুরঘাট আইটি ট্রেনিং সেন্টার বা সফটওয়্যার পার্কের মতো কাঠামোগত ভিত্তি গড়ে উঠেছে।

প্রযুক্তির পরিবর্তনের এই হাওয়া শুধু অর্থনীতি বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে মানুষের মনন ও সংস্কৃতিতেও। চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ আঞ্চলিক ভাষা, ঐতিহ্যবাহী মেজবান, সামুদ্রিক মাছেরসহ রকমারি রান্না কিংবা পাহাড়ি সংস্কৃতির সুবাস আজ আর শুধু পাড়ার আড্ডা বা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই; আধুনিক মোবাইল জেনারেশনের তরুণরা ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের মাধ্যমে চাটগাঁইয়া ভাষাকে বিশ্বদরবারে নতুনভাবে উপস্থাপন করছে। আঞ্চলিক ভাষার গান, কমেডি স্কিট কিংবা লাইফস্টাইল ব্লগ তৈরি করে তারা পৌঁছে যাচ্ছে লাখ লাখ মানুষের কাছে, যা প্রমাণ করে প্রযুক্তির আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এই প্রজন্মের শেকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। বিশ্বায়নের আধুনিকতার সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির এমন সংমিশ্রণ কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; বরং নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে বৈশ্বিক মঞ্চে আত্মপ্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

প্রযুক্তির এই ইতিবাচক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় তরুণদের সামনে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হলেও কিছু সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জও এই রূপান্তরের পথকে প্রভাবিত করেছে। তরুণ সমাজের একাংশ বিভিন্ন সময়ে নানা আন্দোলন বা রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত উন্নয়নের গতি রাষ্ট্রীয়ভাবে কখনো কখনো মন্থর হয়েছে, যা তরুণদের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে কিছু অন্তরায় তৈরি করেছে। বিগত সরকারের সময় গড়ে ওঠা অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আইসিটি প্রকল্পের পাশাপাশি বর্তমান সময়েও তরুণদের মেধাভিত্তিক সমাজ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও প্রসারিত করার জন্য নানামুখী প্রত্যাশা রয়েছে। তরুণরা নিজেদের ক্ষুদ্র উদ্যোগে ফ্রিল্যান্সিং বা ইকমার্স চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভের প্রত্যাশা করে আসছে, যা তাদের পরনির্ভরশীলতা থেকে বের করে আত্মনির্ভরশীল করার পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ও ডিজিটাল সংস্কৃতির প্রভাবে তরুণ প্রজন্মের সামনে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, তেমনি কিছু বাস্তবমুখী চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। সারাক্ষণ স্মার্টফোনে যুক্ত থাকার কারণে বর্তমান প্রজন্মের মনোযোগের পরিসর এবং দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়ার অভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। পাশাপাশি সাইবার বুলিং, ট্রোলিং, অনলাইন জুয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তির মতো বিষয়গুলো মোকাবেলা করে তরুণদের বাস্তবমুখী ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাছাড়া শহর ও মফস্বলের তরুণদের মধ্যকার ডিজিটাল সুযোগের ব্যবধান কমিয়ে গ্রামের বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের ইন্টারনেট অ্যাক্সেস ও আধুনিক ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে সামগ্রিক ডিজিটাল উন্নয়ন আরও টেকসই হতে পারে।

এই সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের আবর্তেই রচিত হচ্ছে চট্টগ্রামের ডিজিটাল জেনারেশনের আগামী ভবিষ্যৎ। আগামী দিনের বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডেটা সায়েন্সের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠবে বিধায় চট্টগ্রাম যদি এই বৈশ্বিক গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চায়, তবে তরুণদের কল্যাণে বাস্তবমুখী প্রকল্প গ্রহণ ও সুশাসন আরও জোরদার করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি কোডিং, প্রবলেম সলভিং ও সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে বাস্তবমুখী কর্মশালা বাড়ানোর মাধ্যমে তরুণদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন করে একটি দুর্নীতিমুক্ত ও মেধাভিত্তিক কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে চট্টগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে আজকের তরুণ প্রজন্ম যে ডিজিটাল স্বপ্ন বুনছে, তা সঠিক পথে পরিচালিত হলে বন্দরনগরীর এই তারুণ্যশক্তি দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় এক অনন্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের প্রাচীন হাট-বাজার
পরবর্তী নিবন্ধজাফর ইকবাল, মাকসুদ কামালসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ