আমরা জানি, আমাদের জাতীয় চেতনায় উজ্জীবিত জীবনমুখী আধুনিক শিশুসাহিত্যের বিকাশের পর্বটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছোটোদের রুচি গঠন ও মানবিক মূল্যবোধ তৈরিতে সহায়ক ‘বাংলা শিশুসাহিত্য’ এখন বিচিত্র ও বহুমাত্রিক। নিজস্ব মৃত্তিকার ইতিহাস–ঐতিহ্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চেতনার মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে বাংলা শিশুসাহিত্যের নবযাত্রা সূচিত হয়েছে। বলা যেতে পারে, বাংলা শিশুসাহিত্য বিষয়বৈচিত্র্যের দিক থেকে প্রায় সর্বপ্রান্তস্পর্শী। আমাদের শিশুসাহিত্যের অঙ্গনও উদ্ভাসিত হয়েছে লব্ধ প্রতিষ্ঠিত লেখকদের সাহিত্যকৃতির বর্ণিল পুষ্প–পল্লবে। তবে বাংলাদেশে ‘শিশুসাহিত্য’ বিষয়ে গবেষণা খুব কমই হয়েছে। এই বিষয়ে বাংলা ভাষায় আমাদের দেশে স্বাধীনতা–উত্তরকালে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে রয়েছে : উৎসে ফেরার ছলচাতুরী – হায়াৎ মামুদ (১৯৯৬), শিশুসাহিত্য: নানা প্রসঙ্গ– আতোয়ার রহমান (১৯৯৮), শিশুসাহিত্যের কতিপয় রথী– আতোয়ার রহমান (২০০১), শিশুসাহিত্যের রূপরেখা – আহমাদ মাযহার (২০০৯), বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য : মনন ও মনীষা – আহমাদ মাযহার, আমাদের শিশুসাহিত্য : নানারঙের ঢেউ – সুজন বড়ুয়া (২০১৭), শিশুসাহিত্যের আলো ছায়া –আমীরুল ইসলাম, বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যভাবনা (১৯৭১–২০০০)- আলম সাইফুল (২০২৫) প্রভৃতি। সেই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত হয়েছে আমার কয়েকটি গবেষণাগ্রন্থ। সেগুলো হলো: বাংলাদেশের ছড়া : রূপ ও রূপকার– রাশেদ রউফ (প্রকাশক :বইপত্র, ঢাকা), ২০০৭, আমাদের শিশুসাহিত্য : ছন্দোময় সোনালি রেখা– রাশেদ রউফ (প্রকাশক : চন্দ্রাবতী একাডেমি, ঢাকা), ২০১৬, বাংলাদেশের কিশোরকবিতা : গতিপ্রকৃতি ও অগ্রগতি (প্রকাশক : ইন্তামিন প্রকাশন, ঢাকা), ২০১৮ ও শিশুসাহিত্য ও আমাদের দায়বদ্ধতা – রাশেদ রউফ (প্রকাশক : চন্দ্রবিন্দু, চট্টগ্রাম),২০১৯। এছাড়াও আছে আরো কয়েকটি গ্রন্থ। উল্লিখিত বইগুলোতে দেশের শিশুসাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের ওপর আলোচনা স্থান পেলেও শিশুসাহিত্যগবেষণা নিয়ে খুব একটা হয় নি।
এ বিবেচনায় পশ্চিমবঙ্গে শিশুসাহিত্য বিষয়ে ব্যাপক কাজ হয়েছে, হয়েছে গবেষণা। প্রকাশিত হয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। ড. পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিশুসাহিত্যের ভূমিকা’ তেমনি একটি গ্রন্থ। পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় একজন প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সম্পাদক। সৃজনশীল, একইসঙ্গে মননশীলও। মৌলিক রচনার পাশাপাশি তিনি শিশুসাহিত্য বিষয়ে অনুসন্ধানে নিয়োজিত আছেন। শ্রম দিচ্ছেন গবেষণায়। প্রচুর লিখেছেন। ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, জীবনী, প্রবন্ধ–গবেষণা মিলিয়ে অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির নানা ইতিহাস নিয়ে তাঁর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ পাঠকমহলে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। অবনীন্দ্রনাথের শিশুসাহিত্যে পিএইচডি এবং বাংলা ছড়ার বিবর্তন নিয়ে গবেষণায় ডি–লিট অর্জন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করা এমন মানুষ বিরল। তাঁর প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা, টান ও শ্রদ্ধা রয়েছে। যখন তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না, তিনি যে কতোটা নিবিষ্ট গবেষক ও সম্পাদক, তা বুঝতে পেরেছিলাম ২০১০ সালে, তখন তিনি পশ্চিমবঙ্গ শিশু কিশোর আকাদেমির কর্মকর্তা। সভাপতি ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ড. পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ঐ বছর পশ্চিমবঙ্গ শিশু কিশোর আকাদেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ঢাউস সাইজের শিশুসাহিত্য সংকলন ‘সবুজ পাতা’। এই সংকলনে তিনি আমার একটি প্রবন্ধ ছাপেন ‘বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্য’ শিরোনামে। পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় যে কত বড়ো গবেষক, তা বোঝা যায় ২০১০ সালে আমার প্রবন্ধ খুঁজে বের করে প্রকাশ করেছেন তাঁর সম্পাদিত গুরুত্বপূর্ণ সংকলনে।
ড. পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিশুসাহিত্যের ভূমিকা’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। প্রকাশক : ‘এবং অধ্যায়’, চুঁচুড়া, হুগলি। প্রচ্ছদ : শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে অগ্রগণ্য লেখক অমরেন্দ্র চক্রবর্তীকে।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় ছোটোদের জন্য প্রচুর লিখেছেন, প্রকাশ করেছেন অসংখ্য বই। সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যাও কম নয়। শুধু সম্পাদনা নয়, ছোটোদের সাহিত্যের বহু হারানো সম্পদও পুনরুদ্ধার করেছেন। পুনরুদ্ধার করে ছেপে দিলেই হতো। কিন্তু তিনি তা করেননি। বইটিকে সর্বাঙ্গসুন্দর করে তোলার চেষ্টা করেছেন। প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করে, সেই তথ্যের যথাযথ ব্যবহার ও উপযুক্ত সম্পাদনা করে হারানো সম্পদটির নতুনভাবে রূপায়ণ করেছেন তিনি। এ পর্যন্ত যে–কয়েকটি সম্পাদিত বই প্রকাশিত হয়েছে, সেইসব বইয়ের নির্বাচিত ভূমিকা– যেগুলো শিশুসাহিত্য–সম্পর্কিত, সেগুলো নিয়ে প্রকাশ করেছেন ‘শিশুসাহিত্যের ভূমিকা’ গ্রন্থটি। এর কনসেপ্টটা অভিনব, নতুন ও গুরুত্ববহ। বইয়ের ভূমিকাগুলো নিয়ে যে আলাদাভাবে গ্রন্থ করা যায়, সেটি তিনি দেখিয়ে দিলেন।
গ্রন্থের ভূমিকায় পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, “পুনরুদ্ধার ও সম্পাদনার কাজ করতে গিয়ে নিজের মৌলিক লেখা যেন বিঘ্নিত না হয়, সে ব্যাপারেও আমায় সতর্ক থাকতে হয়েছে। ছোটোদের জন্য কিছু লিখতে পারলে, তা গদ্য–পদ্য যা–ই হোক না কেন, খুব আনন্দ হয়। সিরিয়াস কোনো বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে পারলেও কম আনন্দ হয় না। তেমনই আনন্দ পাই এইসব পুনরুদ্ধার ও সম্পাদনার কাজে। শিশুসাহিত্য–কেন্দ্রিক আমার যেসব সম্পাদিত বই প্রকাশিত হয়েছে, সেসব বইয়ের ভূমিকা দু–মলাটে একত্রিত করে ‘শিশুসাহিত্যের ভূমিকা’ বইটি প্রকাশিত হল। ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা ভূমিকাগুলি একত্রিত করতে পেরে ভালো লাগছে।”
যেসব গ্রন্থের ভূমিকা সূচিবদ্ধ হয়েছে, সেগুলো হলো : কেন ভুলে যাব প্রমদাচরণকে; বিদ্যাসাগর: নিতান্তই পাঠ্যপুস্তক লেখেননি; অনালোকিত উপেন্দ্রকিশোর; বিস্মৃত সুবিনয়; ঠাকুরবাড়ির গল্প: ছোটোদের জন্য; গগনেন্দ্রনাথ, মোহনলাল ও ‘দাদাভায়ের দেয়ালা‘; অবনীন্দ্রনাথ, মোহনলাল ও ‘চিঠির গল্প‘; ছোটোদের মানিক; নটেগাছ মুড়োয় না, এসব কথা ফুরোয় না; কত না মণিমাণিক্য; হারানোদিনের উজ্জ্বল গল্পমালা : ১; হারানোদিনের উজ্জ্বল গল্পমালা : ২; হারানোদিনের উজ্জ্বল গল্পমালা: ৩; হারানোদিনের উজ্জ্বল গল্পমালা: ৪; ঠাকুরবাড়ির ‘বালক‘; ছোটোদের বার্ষিকী; বাংলা ভাষার প্রথম বার্ষিকী; বার্ষিক শিশুসাথী: সমৃদ্ধির ইতিকথা; বাংলাদেশের ছোটোদের সাহিত্য।
এই ভূমিকাগুলো আসলে একেকটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ। প্রত্যেকটি লেখা আমাদের শিশুসাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য সংযোজন। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শিশুসাহিত্য বিকাশে লেখকের লেখার সঙ্গে প্রকাশনার বিষয়টিও জড়িত। একটা মানসম্পন্ন প্রকাশনা শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে। তাই পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় যেসব বই সম্পাদনা করেছেন এবং সেখানে যে ভূমিকা লিখেছেন, বইগুলো যেমন আমাদের উপকৃত করেছে, তেমনি ভূমিকাগুলো খুলে দিয়েছে আমাদের অন্তর্চোখ।
পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় নিজে লিখেছেন, ‘উৎসাহী পাঠক প্রয়োজনে মূল বইটির সন্ধান করতে পারবেন। শিশুসাহিত্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়–স্তরে ইদানীং নানা কাজ হচ্ছে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পাঠ্যসূচিতে শিশুসাহিত্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশুসাহিত্য কিছুকাল আগেও সেভাবে সম্ভ্রম ও স্বীকৃতি পায়নি। সুখের কথা, এখন পাচ্ছে। শিশুসাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে শুধু নয়, পুরোনো দিনের শিশুসাহিত্য নিয়ে যাঁরা আগ্রহী, সমৃদ্ধির ইতিহাস জানতে চান, তাঁদের এই বইটি কাজে লাগবে।’ আমরা তাঁর সঙ্গে একমত। বর্তমানে শিশুসাহিত্য নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করছেন, তাঁদের কাজে আসবে গ্রন্থটি।
শিশুসাহিত্যে ‘গবেষণা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যদিও আমরা জানি, এ ধরনের কোনো গবেষণার শেষ নেই। প্রতিনিয়ত সক্ষম গবেষকরা পূর্ণাঙ্গতা দানে তৎপর থাকেন। এ গ্রন্থ তেমন এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যেটি আমাদের প্রত্যাশাকে স্পর্শ করেছে। আগামীতে এরকম নতুন অথবা তারচেয়ে সমৃদ্ধ গ্রন্থ প্রকাশিত হবে– সেই প্রত্যাশা আমাদের।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী; ফেলো, বাংলা একাডেমি।










