টেস্টে মহাকাব্যিক জয়

ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস

ক্রীড়া প্রতিবেদক | সোমবার , ১৭ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবিস্মরণীয় একটি দিন। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়। শুধু তাই নয় সাড়ে তিন দিনেই দাপুটে টেস্ট জয়। প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়া দল যে প্রথম টেস্টে শীর্ষ সারির অস্ট্রেলিয়ার মূল দলকে হারিয়ে দেবে তা কেউ চিন্তা করেনি। ডারউইনে তিন দিন ধরে যে একটু একটু করে যে ভিত গড়া হয়েছে, সেটিই গর্বের সৌধ হয়ে উঠল গতকাল চতুর্থ দিনের দ্বিতীয় সেশনে। অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দলকে তাদের আঙিনায় সাড়ে তিন দিন ধরে ভুগিয়ে, তাদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে স্রেফ বিধ্বস্ত করে ছাড়ল র‌্যাঙ্কিংয়ের ৯ নম্বর দল। বাংলাদেশের দাপট স্পষ্ট হয় একটি তথ্যে, গোটা ম্যাচের ১১ সেশনের একটিতেও এগিয়ে ছিল না অস্ট্রেলিয়া। প্রথম দিনে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে জয়ের বীজ বুনে দিয়েছিলেন বোলাররা। সেখান থেকে ব্যাটারদের নৈপুণ্যে বিশাল লিড নিয়ে উঁকি দেয় বিশ্বাসের চারা। এরপর তা বেড়ে উঠতে থাকে এবং ডালপালা ছড়ায়। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া থামে ২৮৪ রানে। ৫৭ রানের জয়ের লক্ষ্য ছুঁতে বেগ পেতে হয়নি একদমই। ব্যাট হাতে ৬৫ রানের ইনিংসের পর অসাধারণ বোলিংয়ে ৫ উইকেট নিয়ে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেন আত্মবিশ্বাসী মেহেদী হাসান মিরাজ। যিনি প্রথমেই বলেছিলেন আমরা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেব। লক্ষ্য যদি ঠিক না থাকে তবে মাঠে তা বাস্তবায়ন করবো কিভাবে। মিরাজ তা করেই ছেড়েছেন। তবে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটিং গুঁড়িয়ে দিয়ে ম্যান অব দা ম্যাচ হয়েছেন পেসার হাসান মাহমুদ। তার ১১১ রানে ৯ উইকেট দেশের বাইরে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড। অস্ট্রেলিয়াতে এখনও কোনো জয়ের মুখ দেখেনি শ্রীলঙ্কা। পাকিস্তান সবশেষে জিতেছে ১৯৯৫ সালে এবং এরপর থেকে টানা ১৭ টেস্ট হেরেছে। বাংলাদেশ গড়ে ফেলেছে অভাবনীয় কীর্তি। গতকাল রোববার ৪ উইকেটে ১৬১ রান নিয়ে দিন শুরু করে অস্ট্রেলিয়া। আগের দিন জমে যাওয়া গ্রিন ও অ্যালেক্স কেয়ারির জুটি এ দিন আর বেশি দীর্ঘায়িত হয়নি। স্পিনে দক্ষ কেয়ারিকে দারুণ এক ডেলিভারিতে ফেরান মিরাজ। একটু পর আরও দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে তিনি বোল্ড করে দেন বিউ ওয়েবস্টারকে। বিভ্রান্ত ব্যাটার আউট হয়ে হতভম্ব হয়ে যান পুরোপুরি। জয়ের সুবাস তখনই ছড়িয়ে পড়তে থাকে বাতাসে। মিরাজ ফিরিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকেও। গত অ্যাশেজে বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও ইংল্যান্ডকে ভোগানো মিচেল স্টার্ক এরপর জুটি গড়ার চেষ্টা করেন গ্রিনের সঙ্গে। কিছুটা লড়াই করে লাঞ্চে যায় অস্ট্রেলিয়া। তবে লাঞ্চ সেরে এসে বাংলাদেশও ফিরে আসে প্রবলভাবে। দ্বিতীয় নতুন বলে স্টার্ককে ফিরিয়ে ৪৩ রানের জুটি ভাঙেন তাসকিন আহমেদ। এক প্রান্তে লড়াই করে গ্রিন পৌঁছে যান সেঞ্চুরিতে। স্রেফ চারটি চার ও একটি ছক্কা ছিল তার ইনিংসে, তার মনোসংযোগ ও লড়াইয়ের চিত্র ফুটে ওঠে এতেই। তবে এরপর আর বেশিক্ষণ এগোতে পারেননি তিনিও। হাসানের নিচু হওয়া এক ডেলিভারি তার ব্যাটের নিচের অংশে লেগে ছোবল দেয় স্টাম্পে। ন্যাথান লায়নকে ফিরিয়ে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করার পাশাপাশি ইনিংসও শেষ করে দেন মিরাজ। তার বোলিং পারফরম্যান্স কতটা অসাধারণ, তা বোঝা যাবে একটি তথ্যে। মুত্তিয়া মুরালিধরন, হরভজন সিং, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, ইয়াসির শাহ, রবিন্দ্র জাদেজার মতো গ্রেটরা কখনও অস্ট্রেলিয়াতে পাঁচ উইকেটের স্বাদ পাননি। ছোট্ট রান তাড়ায় শূন্য রানে ফেরেন প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে হোঁচট বলতে ওই সামান্যটুকুই। এরপর সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক পরের পথটুকু পাড়ি দেন কোন ঝামেলা ছাড়া অনায়াসেই। ৪২ বলে ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন সাদমান, ৩৯ বলে ২৫ রানে মুমিনুল। বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্মরণীয়তম জয়টি ধরা দেয় সাবেক টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুলের বাউন্ডারিতেই। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন জানালেন, যে কোনো সংস্করণে এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা জয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবহির্নোঙরে জাহাজের নোঙর সরে ঘটছে দুর্ঘটনা, উদ্বেগ
পরবর্তী নিবন্ধ২২টি টং জাল, কারেন্ট জালসহ বিপুল অবৈধ সরঞ্জাম জব্দ