জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা চাই

| সোমবার , ২৭ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৩৫ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, দেশে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, বিদ্যমান শিল্পে উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রয়োজন টেকসই জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা। নির্ভরযোগ্য, স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় শিল্প খাতের উৎপাদন ও রফতানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের বিনিয়োগও আটকে যাচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রতিযোগিতা সক্ষমতার বিকাশ এবং রাজস্ব আহরণ টেকসই করতে স্থানীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানি ও আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা না গেলে সামনের দিনগুলোয় অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। জ্বালানি খাতের জন্য দরকার পূর্বানুমানযোগ্য ও সমন্বিত নীতিকাঠামো। দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য জ্বালানি খাতের রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। জ্বালানি সংকটের সুরাহা না হলে সরকারের অন্য সব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। বণিক বার্তা আয়োজিত এই আলোচনায় জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও ব্যাংকাররা এসব কথা তুলে ধরেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির অবকাঠামো আরো শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি না হয়।’

জ্বালানি আমদানির পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, ‘যদি আমরা আমদানি নির্ভরতার দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায় গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ, তেলের ৯৫ শতাংশ এবং কয়লার ৯০ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাস্তবতা। এর ফলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে মূল্য ওঠানামা, সরবরাহে বিঘ্ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের মতো ঝুঁকির মুখে পড়ে, যা আমরা সামপ্রতিক সময়ে প্রত্যক্ষ করেছি। তবে বিষয়টি শুধু আমদানিনির্ভরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমে যাচ্ছে। অতীতের বিদ্যুৎ উৎপাদনসংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তির ব্যয়ের দায়ও এখন আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং খাতটির আর্থিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে।’

বিশ্লেষকরা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। এই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যাপকভাবে কমে যায়, যা নতুন শিল্প ও উৎপাদন প্রকল্পে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। উচ্চ সুদের হার, ব্যয়বহুল কাঁচামাল ও অনিশ্চিত মুদ্রানীতি ব্যবসায়ীদের ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহ করেছে। ফলে বিনিয়োগ স্থবিরতা সার্বিক প্রবৃদ্ধিকে টেনে নামিয়েছে। তবে একই সময়ে রপ্তানি খাত কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। তৈরি পোশাক, চামড়া, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্য খাতের সাফল্যে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৮.৮ শতাংশ। প্রবাস আয়ও ইতিহাসের অন্যতম উচ্চ পর্যায়ে উঠে এসেছে প্রবৃদ্ধি পেয়ে। এই দুটি খাতের ইতিবাচক প্রভাবেই অর্থনীতি পুরোপুরি সংকটে না পড়ে স্থিতিশীল থাকার চেষ্টা করেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রবৃদ্ধি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রায় ৪.৮ শতাংশ হতে পারে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমবে এবং ভোগব্যয় বাড়লে চাহিদা পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, সংস্কার বিলম্ব এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হিসেবে থেকে যাবে। তাঁদের মতে, রপ্তানি বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প আগামী বছরও প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হবে। তবে আমদানি স্বাভাবিক হলে চলতি হিসাব আবার ঘাটতিতে যেতে পারে। রাজস্ব ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা নিচ্ছে, যদিও কৃষি ও জ্বালানি খাতে ব্যয় এখনো বেশি থাকবে। সরকারি ঋণও বাড়ছে, ২০২৭ সালের মধ্যে তা জিডিপির ৪১.৭ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত রোডম্যাপ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে