জ্বালানি সংকট কাটাতে ৫ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে

সংসদে প্রধানমন্ত্রী

| বৃহস্পতিবার , ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:১১ পূর্বাহ্ণ

দেশে চলমান জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণে সরকার পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এই পাঁচ কর্মপরিকল্পনা হলদেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সাইসমিক জরিপ, বাপেক্সকে শক্তিশালীকরণ, প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট (পিএসসি) ও বিডিং এবং এলএনজি অবকাঠামো সস্প্রসারণ। গতকাল সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের এই কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ দিনের অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানি নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

অধিবেশনের শুরুতে আধা ঘণ্টা সময় নির্ধারিত ছিল প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নোত্তর পর্ব। এই পর্বে প্রধানমন্ত্রীর জন্য লিখিত প্রশ্ন ছিল ৮টি। আধা ঘণ্টা সময়ে ৪টি লিখিত প্রশ্ন এবং ৬টি সস্পূরক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। খবর বিডিনিউজের।

সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণের সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ খনন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চলমান ৭টি কূপ খনন শেষ হলে আরও ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ৪৫০০ লাইন কিলোমিটার টুডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪২০০ বর্গ কিলোমিটার থ্রিডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এঙপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেঙ) শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে আরও দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলমান আছে বলে তথ্য দেন সরকার প্রধান। প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট বা পিএসসি ও বিডিং প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অফশোর এবং অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কঙবাজার জেলার মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোমে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা চলমান রয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৮ সালে এই টার্মিনাল হতে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে আশা করছি। ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বৃদ্ধি পাবে। পায়রা বা মংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ২/১টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন হলে সামগ্রিকভাবে দেশে জ্বালানি সমস্যার সমাধান ও জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।

সংরক্ষিত আসনের আরেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়াতে বর্তমান সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ গত ৬ জুন সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য অপরিহার্য পণ্য যেমনসোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ইত্যাদির ওপর আরোপ করা কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং ২ শতাংশ অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর হতে শর্তসাপেক্ষে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।

আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করবেন তাদের সরবরাহ করা বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০.৫০ টাকা করে কিনবে বলেও তথ্য দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাল্ক রেটের অতিরিক্ত টাকা সরকার প্রণোদনা হিসেবে দেবে। ফলে গড়ে উৎপাদন মূল্য ৬৭ টাকা প্রতি ইউনিট হিসেবে ৪৫ শতাংশ (৪০% মুনাফা ও ৫% প্রিমিয়াম) পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই সুবিধা পরবর্তী তিন বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে।

প্রধানমন্ত্রী সংসদকে বলেন, দেশের সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ছাদে সোলার সিস্টেম স্থাপনের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থাসমূহকে ইতোমধ্যে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ইতোমধ্যে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। সোলার ছাড়াও পানি বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি উক্ত কার্যক্রমসমূহ বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি সংকট মোকাবেলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে।

কুমিল্লা১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাত ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য সরকার আগামী দশ বছর কি কি করবে সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। যতটুকু আমার ধারণা আছে, দ্রুতই সংসদের সামনে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী উপস্থাপন করবেন দেশের সামনে, আগামী দশ বছর কীভাবে আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সাজানোর চেষ্টা করছি। যাতে করে আমরা ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে টার্গেট করেছি, সেটা অর্জন করতে সক্ষম হই।

সংরক্ষিত আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্য যে উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন, অবশ্যই আমরা দেশে যেই সমস্যাটি আছে জ্বালানির, এটিকে সমাধান করতে চাইছি। ফুলবাড়ীতে যে কয়লার কথা উনি বলেছেন, সেই কয়লা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো কয়লার মধ্যে একটি। কাজেই আমরা এই কয়লাটিকে উত্তোলন করে যদি আমাদের জ্বালানি সংকট মেটাতে পারি, অবশ্যই সেটা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা যেরকম সাশ্রয় করবে, একইভাবে দেশের জন্য সেটি ভালো হবে। অবশ্যই কয়লাটি উত্তোলন করতে গেলে ওপেন পিট যদি করতে হয়, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে কিছু বসতবাড়ি আছে। সেখানে কৃষি জমি আছে। আমরা যেহেতু রাজনীতি করি দেশের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য; অবশ্যই সবচেয়ে আগে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কীভাবে সেই মানুষগুলোকে আগে সেটেলমেন্ট করা যায়। তাদের যাতে আয় রোজগার বন্ধ না হয় বরং সেই প্রকল্প গ্রহণ করলে যাতে তারা কোন না কোনভাবে লাভবান হতে পারে, সে সব ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেই এবং অবশ্যই পরিবেশের যে বিষয়টি আছে সেটিকে গুরুত্ব দিয়েই আমরা যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম বন্দরের সেবা মাশুল পরিশোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা
পরবর্তী নিবন্ধশাহ আমানত বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক অপারেটরকে দেওয়ার চিন্তা