জ্বালানি খাতের হৃৎপিণ্ড চট্টগ্রাম : বিপিসি প্রধান কার্যালয় সরানোর নেপথ্যে কার স্বার্থ?

মোহাম্মদ আইয়ুব | সোমবার , ৬ জুলাই, ২০২৬ at ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই ও অর্থবহ হয়, যখন নীতিনির্ধারণে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মূল বিবেচনা হওয়া উচিত দক্ষতা, জবাবদিহিতা, সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং জনগণের কল্যাণ। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত যদি এসব মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হয়, তবে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিক দায়িত্বেরই অংশ।

সমপ্রতি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের আলোচনা নতুন করে সেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি কেবল একটি অফিস স্থানান্তরের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, প্রশাসনিক দক্ষতা, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য এবং সরকারের ঘোষিত উন্নয়ন দর্শন।

বাংলাদেশের প্রায় সমগ্র জ্বালানি আমদানি কার্যক্রম চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। দেশের অধিকাংশ অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই দেশে প্রবেশ করে। বিপিসির প্রধান ডিপো, সংরক্ষণ সুবিধা, পাইপলাইন অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সিংহভাগও চট্টগ্রামকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। ফলে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকা কোনো আকস্মিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাস্তব প্রয়োজন ও কৌশলগত পরিকল্পনার ফল।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই বন্দর, জ্বালানি, লজিস্টিকস ও আমদানিনির্ভর কৌশলগত প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি রাখা হয়। কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও বাস্তবায়নকারী ইউনিটের মধ্যে দূরত্ব যত বাড়ে, সমন্বয় ব্যয়, সময় অপচয় এবং প্রশাসনিক জটিলতাও বৃদ্ধি পায়। বিপিসির প্রায় পুরো কার্যক্রম যখন চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক, তখন প্রধান কার্যালয়ও সেখানে থাকাই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে অধিক যৌক্তিক।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি অর্থে চট্টগ্রামে বিপিসির জন্য একটি আধুনিক প্রধান কার্যালয় নির্মাণে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। সরকারি অর্থে নির্মিত এই অবকাঠামো পুরোপুরি ব্যবহারের আগেই যদি প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত এই অবকাঠামো কার্যকরভাবে ব্যবহার না করে নতুন ব্যয়ের পথ বেছে নেওয়া হলে তা জনসম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেবে।

প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের অর্থ শুধু কর্মকর্তাদের কর্মস্থল পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হবে নতুন জমি অধিগ্রহণ, ভবন নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং পরিচালন ব্যয়। এতে সরকারের শত শত কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেখানে বিদ্যমান অবকাঠামো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব, সেখানে নতুন করে বিপুল অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া কঠিন। স্থানান্তরের পক্ষে কেউ কেউ যুক্তি দিতে পারেন যে অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ঢাকায় হওয়ায় নীতিগত সমন্বয় সহজ হবে। তবে আধুনিক ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগে এই যুক্তি কতটা কার্যকর, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে সরকারি অর্থ অপচয়, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। কারণ জনগণ জানতে চাইবে বিদ্যমান অবকাঠামোকে অকার্যকর করে নতুন ব্যয়ের প্রয়োজন কেন?

অন্যদিকে ঢাকা ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত জনসংখ্যা, তীব্র যানজট, পরিবেশ দূষণ এবং অবকাঠামোগত চাপের ভারে বিপর্যস্ত। উন্নত বিশ্বের বহু দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারতও প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণে গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন কখনোই সুষম জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরনগরী। এটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। আমদানিরপ্তানি, শিল্পায়ন, জ্বালানি সরবরাহ এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থার বড় অংশ এই নগরীকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ চট্টগ্রামে সংঘটিত হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এখনও অতিমাত্রায় ঢাকাকেন্দ্রিক।

দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক গুরুত্বের তুলনায় প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ খুবই সীমিত। ফলে অনেক সময় অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি হয়।

বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও একাধিকবার চট্টগ্রামকে প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও চট্টগ্রামকে প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাতেও চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক গুরুত্ব আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বিপিসির মতো বন্দরনির্ভর ও কৌশলগত একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের উদ্যোগ ঘোষিত নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।

ভূপ্রাকৃতিক ও স্বভাবজাতভাবেই চট্টগ্রামের মানুষ সংগ্রামী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে বিগত সরকারের আমলে, যখন চট্টগ্রামের ফুসফুস ও হৃদপিণ্ড খ্যাত ঐতিহাসিক সিআরবি(CRB) সবুজ প্রকৃতি ধ্বংস করে বেসরকারি হাসপাতাল নির্মাণের পাঁয়তারা করা হয়েছিল। চট্টগ্রামের আপামর জনসাধারণ দলমত নির্বিশেষে স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। প্রকৃতির অধিকার রক্ষার সেই তীব্র গণদাবির মুখে শেষ পর্যন্ত তৎকালীন সরকার তাদের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়। চট্টগ্রামের মানুষের এই বিজয় প্রমাণ করে, ন্যায্য অধিকার আদায়ে তারা কখনো আপস করে না।

চট্টগ্রামের মানুষ কখনো বিশেষ সুবিধা চায় না। তারা চায় ন্যায্য মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার স্বীকৃতি। দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখা একটি অঞ্চল যদি বারবার কেন্দ্রভিত্তিক সিদ্ধান্তের কারণে বঞ্চনার অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়, তাহলে তা জাতীয় সংহতি ও আস্থার জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কেবল একটি অফিস কোথায় থাকবে সেই প্রশ্ন নয়। এটি জাতীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলের প্রশ্ন। কোনো সিদ্ধান্ত যদি জনগণের মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টি করে যে অর্থনৈতিক যুক্তির চেয়ে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কেন্দ্রভিত্তিক সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তাহলে তা জনআস্থা ক্ষুণ্ন করবে এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের বিশ্বাস দুর্বল করবে।

বরং এখন সময় এসেছে বন্দর, জ্বালানি, রপ্তানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট আরও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা বা স্থানান্তরের বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবার। এতে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে, ঢাকার ওপর চাপ কমবে এবং দেশের সুষম উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

দীর্ঘ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রশিক্ষক, রিসোর্স পার্সন ও বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ, পুঁজিবাজার এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বিকাশ নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী হাজারো মানুষের মতামত এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ থেকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ অর্থনৈতিক যুক্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হবে।

তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রতি বিনীত আহ্বান বিষয়টি কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সাময়িক প্রশাসনিক সুবিধার আলোকে নয়; বরং জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, বিকেন্দ্রীকরণ নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের আলোকে পুনর্বিবেচনা করা হোক।

জ্বালানি খাতের কেন্দ্র চট্টগ্রামেই বিপিসির প্রধান কার্যালয় বহাল রাখা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কৌশলগত প্রয়োজন, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক দক্ষতা এবং সুষম উন্নয়নের স্বার্থেই বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামেই থাকা অধিকতর যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত এবং জাতীয় স্বার্থসম্মত।

লেখক: প্রশিক্ষক, রিসোর্স পার্সন ও বিনিয়োগ শিক্ষা বক্তা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসৃজনশীল পরিকল্পনা হোক যুবসমাজ রক্ষার মূল ভিত্তি
পরবর্তী নিবন্ধআমার শহর, আমার দায়িত্ব : পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রামের প্রত্যয়