আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, যে জাতি তার বীরদের রক্তের মূল্যায়ন করে না, সে দেশে আর বীরের জন্ম হয় না। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জুলাই বর্ষপূর্তির মাসে দেশে হানাহানি ও সংঘাত দেখার জন্য আবু সাঈদ, মুগ্ধদের মতো শহীদরা জীবন দেননি।
গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শহীদ আবদুর রব হল মাঠে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘জাগ্রত জুলাই কালচারাল ফেস্ট–২০২৬’–এর প্রথম দিনের আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে বেলা ১১টায় উৎসবের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্–ফোরকান। বিকেল ৪টায় একই স্থানে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্–ফোরকান। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপ–উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম ও চাকসুর সাবেক ভিপি এডভোকেট মো. জসিমউদ্দিন সরকার।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি, স্বাগত বক্তব্য দেন চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব। সঞ্চালনা করেন চাকসুর সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা সম্পাদক হারেস মাতুব্বর, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক মোনায়েম শরীফ এবং গবেষণা সম্পাদক তানভীর আঞ্জুম শোভন।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, বিগত দিনে আমরা অনেকটি বছর একটি অভিন্ন দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছি। কিন্তু আজ কেন আমরা একজন আরেকজনের ওপর হামলা করছি? এমন দৃশ্য আমরা বাংলাদেশে দেখতে চাই না। আসুন, সবাই নিজ নিজ দায়িত্বের প্রতি সচেতন হই। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, যে জাতি তার বীরদের রক্তের মূল্যায়ন করে না, সে দেশে আর বীরের জন্ম হয় না। আমরা যদি শহীদদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা পালন না করি, তাহলে আসহাবুল ইয়ামিন, আবু সাঈদদের মতো মানুষ আর আমাদের রক্ষায় জীবন দিতে এগিয়ে আসবে না। তাই জুলাইয়ের প্রতিটি শহীদের আত্মত্যাগ ও রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্–ফোরকান বলেন, আজ সকালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘর পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন আলোকচিত্র দেখছিলাম। একটি ছবিতে দেখলাম ছাত্রদলের নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমান এবং তৎকালীন ছাত্রনেতা ইব্রাহিম হোসেন রনি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একই স্লোগান দিচ্ছেন। সেই দৃশ্য আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়– মতের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে, ন্যায়ের প্রশ্নে এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হওয়াই আমাদের শক্তি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপ–উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, অতীতে আমাদের দেশে দুর্নীতি, বৈষম্য এবং নানা ধরনের অনিয়ম সমাজ ও রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সেই বাস্তবতা থেকেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা আমাদের সামনে একটি নতুন স্বপ্ন ও নতুন প্রত্যাশার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন শহীদ ফরহাদ হোসেনের বড় ভাই গোলাম কিবরিয়া, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলী ও রাসেল আহমেদ। এছাড়া আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকবৃন্দ এবং জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে জুলাই আহতদের সম্মাননা প্রদান করা হয় এবং জুলাই আন্দোলনের ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানে ছাত্র–ছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা পরিচালক, বিভিন্ন শিক্ষক, আমন্ত্রিত অতিথি, চাকসুর প্রতিনিধিবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ দুই দিনব্যাপী উৎসবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, বিভিন্ন প্রদর্শনী এবং দর্শনার্থীদের জন্য নানা আয়োজন রাখা হয়েছে। বিভিন্ন স্টল ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখার পাশাপাশি দর্শনার্থীরা প্রতীকী আয়নাঘর, ফাঁসির মঞ্চ, হারুনের ভাতের হোটেলসহ বিভিন্ন থিম ভিত্তিক উপস্থাপনা উপভোগ করেন।












